দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশ আজ আর কেবল একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র নয়; বরং এটি আঞ্চলিক অর্থনীতি, সংযোগ, নিরাপত্তা ও কৌশলগত ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। বঙ্গোপসাগর, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। বিশেষ করে ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে। উভয় দেশের কিছু কূটনৈতিক পদক্ষেপ ও পাল্টা পদক্ষেপ জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহুমুখীকরণের প্রবণতাও আরও দৃশ্যমান হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকারের এক উপদেষ্টার ভারত সফরে বিমানবন্দরে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশে আলোচনা হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে এমন পরিস্থিতি অনাকাঙ্ক্ষিত হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান ও শিষ্টাচার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম ভিত্তি। এ ধরনের ঘটনা যদি ভুল বোঝাবুঝিরও ফল হয়ে থাকে, তবুও তা দুই দেশের জনগণের মধ্যে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় ভিসা নীতির কড়াকড়ি বাংলাদেশের সাধারণ নাগরিক, শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীদের জন্য বাস্তব সমস্যার সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে পর্যটন ভিসা সহজ করার উদ্যোগের আলোচনা নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি কেবল জনসম্পর্ক উন্নয়নের বিষয় নয়; বরং আঞ্চলিক অর্থনীতি, পর্যটন এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার বাস্তবতাকেও প্রতিফলিত করে।
এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে চীন সফর আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী, অবকাঠামো বিনিয়োগকারী এবং বাণিজ্যিক অংশীদার। তাই এই সফরকে অনেকেই বাংলাদেশের বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতির স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। একই সময়ে ভারতের পক্ষ থেকে তিস্তা নদীর পানি বণ্টনসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন করে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশের বিষয়টিও বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। তবে এসব উদ্যোগের পেছনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান ও বাস্তব অগ্রগতিকে বিবেচনায় নেওয়াই যুক্তিযুক্ত।
বাংলাদেশ কখনোই কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেনি। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি “সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়”—এই নীতিকে ধারণ করেছে। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায়ও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। বাংলাদেশ একদিকে যেমন ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তেমনি চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, তুরস্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য অংশীদার দেশের সঙ্গেও সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী। এটিকে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নয়, বরং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক কৌশল হিসেবে দেখা অধিকতর বাস্তবসম্মত।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ইতিহাসে ইতিবাচক ও জটিল—দুই ধরনের অধ্যায়ই রয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আবার তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্তে প্রাণহানি, বাণিজ্য ভারসাম্য, ভিসা, অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা এবং পারস্পরিক আস্থার ঘাটতির মতো বিষয়গুলো এখনও অমীমাংসিত রয়েছে। ফলে সম্পর্কের মূল্যায়নও হওয়া উচিত এই দুই বাস্তবতাকে সামনে রেখে।
ভারতে মুসলিমসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অধিকার ও নাগরিকত্ব নিয়ে যে বিতর্ক আন্তর্জাতিক মহলে আলোচিত হয়েছে, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনারও অংশ। একই সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করে অনিয়মিত প্রবেশ বা “পুশব্যাক” সংক্রান্ত অভিযোগও সময়ে সময়ে দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এসব বিষয়ে টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের নীতির প্রতি উভয় পক্ষের অঙ্গীকার।
রোহিঙ্গা সংকটও এই অঞ্চলের অন্যতম বড় নিরাপত্তা ও মানবিক চ্যালেঞ্জ। প্রায় এক দশক ধরে বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু তাদের নিরাপদ ও স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। এ ক্ষেত্রে ভারত, চীন, আসিয়ান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সক্রিয় ও সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। কারণ, এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি সমগ্র অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা যায়। কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি অপ্রয়োজনীয় বৈরিতাও দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয়। একটি আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র তার কূটনৈতিক বিকল্প বিস্তৃত করে, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে সংলাপের পথ বন্ধ করে না।
আজকের বিশ্বে ভূ-রাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশের অবস্থান দিন দিন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই প্রয়োজন আবেগ নয়, প্রজ্ঞা; প্রতিক্রিয়া নয়, কৌশল; এবং সংঘাত নয়, সম্মানজনক পারস্পরিক সহযোগিতা।
বাংলাদেশের জনগণ একটি মর্যাদাপূর্ণ, সমঅধিকারভিত্তিক ও পারস্পরিক সম্মাননির্ভর সম্পর্ক প্রত্যাশা করে। ভারতও যদি একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চায়, তবে আস্থা পুনর্গঠন, অসমাপ্ত ইস্যুগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে সহযোগিতা—এই তিনটিই হতে পারে ভবিষ্যৎ সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।
লেখক: মোহাঃ খোরশেদ আলম
গবেষক, কলামিস্ট ও মানবাধিকারকর্মী