বাবার স্বপ্ন পূরণে ২২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে : কায়সার আলম সেলিম

মোঃ আনজার শাহ:

দীর্ঘ ২২ বছরের অপেক্ষা ও নানা বাধাবিপত্তি পেরিয়ে অবশেষে আলোর মুখ দেখল কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ির মানুষের স্বপ্নের হাসপাতাল। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় “এ.কে.এম. আবু তাহের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল”। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমন।

বাবার স্বপ্ন, ছেলের হাতে বাস্তবায়ন:
হাসপাতালটি উদ্বোধন করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, “বাবার স্বপ্ন পূরণে ২২ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমার বাবা এই এলাকার মানুষের সেবায় বহুমুখী উন্নয়নের স্বপ্ন দেখেছিলেন। স্বাস্থ্যসুরক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার।” তিনি আরও জানান, তাঁর পিতা মরহুম সংসদ সদস্য এ.কে.এম. আবু তাহের এলাকার মানুষের চিকিৎসার দুর্ভোগ লাঘবের লক্ষ্যেই এই হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন।

জানা যায়, মরহুম আবু তাহের ব্যক্তিগত উদ্যোগে হাসপাতালের জন্য জমি ক্রয় করে তা সরকারের কাছে দান করেছিলেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় ২০০৩ সালের ১৯ মে হাসপাতালটির উদ্বোধন হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস  মাত্র এক বছরের মাথায়, ২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন। এরপর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতায় হাসপাতালটি ক্রমে অচল হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে বহু বছর।

মিলাদ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠান:
উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত মিলাদ মাহফিল ও দোয়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেলা সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি ডেপুটি সিভিল সার্জন, বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা এবং পুনরায় চিকিৎসাসেবা চালুর প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।

বক্তব্যে কায়সার আলম সেলিম বলেন, জনগণের ভোটে জাকারিয়া তাহের সুমন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জাতীয় সংসদে যাওয়ার পর এবং পরবর্তীতে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর বরুড়ার উন্নয়নে নতুন করে কাজের গতি সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরই আন্তরিক উদ্যোগে সোনাইমুড়ি এ.কে.এম. আবু তাহের ২০ শয্যা হাসপাতাল পুনরায় চালুর দীর্ঘলালিত স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মরহুম সংসদ সদস্য এ.কে.এম. আবু তাহের সাহেব এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবার কথা চিন্তা করেই হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন এবং নিজ উদ্যোগে জমি ক্রয় করে তা সরকারের কাছে দান করেছিলেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে হাসপাতালটির উদ্বোধন করা হলেও, এর কিছুদিন পরই ২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন।

পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যসেবার পথে:
হাসপাতালটি উদ্বোধনের পর প্রাথমিকভাবে বহির্বিভাগের (আউটডোর) চিকিৎসাসেবা চালু করা হবে বলে জানানো হয়। আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা চালুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। দক্ষিণ বরুড়া, আদ্রা ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকার মানুষের জন্য এই হাসপাতাল ভবিষ্যতে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বক্তারা।

চিকিৎসাসেবা চালুর পর রোগীর চাপ বাড়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে বক্তারা চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধৈর্য ও মানবিকতার সঙ্গে রোগীদের সেবা দেওয়ার আহ্বান জানান। গুরুতর রোগীদের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ সংশ্লিষ্ট বড় হাসপাতালে স্থানান্তরের সুব্যবস্থার কথাও তুলে ধরা হয়।

স্বাস্থ্যসেবার পরিধি সম্প্রসারণে নতুন পরিকল্পনা:
কায়সার আলম সেলিম আরও জানান, বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বর্তমান ৩৫ শয্যার সক্ষমতা বাড়িয়ে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে পর্যায়ক্রমে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বরুড়াও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে, যা ভবিষ্যতে বরুড়াবাসীর স্বাস্থ্যসেবার পরিধি আরও বিস্তৃত করবে।

জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রায় ১০ কোটি ৬০ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪০ টাকা ব্যয়ে হাসপাতালটি নির্মাণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোনাইমুড়ি ২০ শয্যা হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে “এ.কে.এম. আবু তাহের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল” রাখা হয়।

একটি স্বপ্নের বাস্তব প্রতিফলন:
বক্তব্যের শেষাংশে আবেগঘন কণ্ঠে কায়সার আলম সেলিম বলেন, “এই হাসপাতাল শুধু একটি ভবন বা চিকিৎসাকেন্দ্র নয়; এটি মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহের সাহেবের স্বপ্ন এবং জাকারিয়া তাহের সুমনের উন্নয়ন-ভাবনার এক বাস্তব প্রতিফলন।” হাসপাতালটি সফলভাবে পরিচালনার জন্য স্থানীয় জনগণ ও কর্তৃপক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

দোয়া ও মোনাজাত:
মিলাদ মাহফিল শেষে দেশ, জাতি ও এলাকার মানুষের কল্যাণ এবং হাসপাতালটির সফল পরিচালনার জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়। একই সঙ্গে মরহুম এ.কে.এম. আবু তাহের সাহেব ও তাঁর পরিবারের প্রয়াত সদস্যদের জন্য দোয়া কামনা করা হয়। গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে বক্তারা বলেন, মানুষের কল্যাণে তাঁর চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আরও এগিয়ে যাক। দীর্ঘ ২২ বছরের অপেক্ষা শেষে প্রাণ ফিরে পাওয়া এই হাসপাতাল যেন সোনাইমুড়িবাসীর জন্য নতুন এক আশার আলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *