বিআইডব্লিউটিএ-তে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ কম দামে বিক্রির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-কে ঘিরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ অত্যন্ত কম মূল্যে বিক্রির গুরুতর অভিযোগ সামনে আসায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি কথিত প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যারা দীর্ঘদিন ধরে ড্রেজিং, নদী খনন, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন প্রকল্পকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।

এই অভিযোগে বিআইডব্লিউটিএ’র বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের নাম বিশেষভাবে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট একটি শক্তিশালী চক্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হস্তান্তর, বিক্রয় ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। বিষয়টি ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর নজরে এসেছে এবং সংস্থাটি এ নিয়ে একটি বিশেষ অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করেছে।

প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার সম্পদ মাত্র কয়েক কোটি টাকায় বিক্রির অভিযোগ

অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার সরকারি সম্পদ মাত্র ২ কোটি ৭৯ লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৮ টাকায় “টোকিও মিল জেভি” নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা হয়েছে। এত বড় অঙ্কের রাষ্ট্রীয় সম্পদ অস্বাভাবিকভাবে কম মূল্যে হস্তান্তরের ঘটনায় প্রশাসনিক মহলেও বিস্ময় ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়ায় বাজারমূল্য গোপন রেখে পরিকল্পিতভাবে কম দর দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এতে রাষ্ট্র বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতির শিকার হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

মাতারবাড়ি প্রকল্প ও ড্রেজিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে অনিয়মের অভিযোগ

জানা গেছে, মাতারবাড়ি বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় মহেশখালী চ্যানেলের নুনিয়ার ছড়া থেকে আদিনাথ মন্দিরের উজান পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে প্রায় ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৫৯ হাজার ১৮২ ঘনফুট বালু ও মাটি উত্তোলন করা হয়।

এই ড্রেজিং কার্যক্রমকে কেন্দ্র করেই অভিযোগের সূত্রপাত বলে জানা যায়। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন ধাপে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান, এবং উত্তোলিত বালু ও মাটি বিক্রির ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করছে, পুরো প্রক্রিয়াটি একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে সাজানো হয়েছিল।

এছাড়া জেলা প্রশাসনের যথাযথ অনুমোদন ছাড়া এত বিপুল পরিমাণ বালু ও মাটি উত্তোলন এবং বিক্রি কীভাবে সম্ভব হলো, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মোবাইল কোর্টের নথি ও জব্দ তালিকা ঘিরে নতুন তথ্য

দুদক ইতোমধ্যে ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর পরিচালিত মোবাইল কোর্টের নথি, জব্দ তালিকা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সংগ্রহ করেছে। এসব নথি পর্যালোচনা করে ড্রেজড ম্যাটেরিয়াল বাণিজ্যের আড়ালে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।

অনুসন্ধানকারীরা বলছেন, ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে উত্তোলিত সম্পদ বিক্রির ক্ষেত্রে প্রকৃত বাজারমূল্য গোপন রেখে কম দর দেখানো হয়, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শুধু কক্সবাজার নয়, ঢাকাসহ অন্যান্য নদীবন্দরেও অভিযোগ

অভিযোগের পরিধি শুধু মাতারবাড়ি বা কক্সবাজার অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগও উঠেছে।

বিশেষ করে তুরাগ ও বুড়িগঙ্গা নদীতীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, নদীতীর ইজারা প্রদান এবং রাজস্ব আদায় ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় সিন্ডিকেট গঠনের অভিযোগ

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছিল, যা নদী, বন্দর, ড্রেজিং, ইজারা এবং প্রকল্পকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করত।

এই চক্রের মাধ্যমে সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে ঠিকাদারি নিয়োগ এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ বাণিজ্য চলত বলে অভিযোগ উঠেছে।

দুদকের বিশেষ অনুসন্ধান টিম গঠন

এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুই সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষ অনুসন্ধান টিম গঠন করেছে। টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন উপপরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম এবং সদস্য হিসেবে আছেন সহকারী পরিচালক সুভাষ চন্দ্র মজুমদার।

ইতোমধ্যে টিমটি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই-বাছাই শুরু করেছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

দুদক সূত্র জানায়, তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের দায়িত্ব থেকে সাময়িকভাবে অব্যাহতি দেওয়ার দাবিও বিভিন্ন মহল থেকে উঠেছে।

প্রশাসনিক দুর্নীতির বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা

সুশীল সমাজ ও প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, বিআইডব্লিউটিএকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ দেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার একটি বড় উদাহরণ। তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পভিত্তিক দুর্নীতি, টেন্ডার কারসাজি, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং সিন্ডিকেট নির্ভর প্রশাসন মিলিয়ে একটি “প্রাতিষ্ঠানিক লুটপাটের মডেল” গড়ে উঠেছে।

এ ধরনের অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং সমগ্র রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নে গুরুতর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করছেন তারা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিআইডব্লিউটিএ’র পরিচালক এ. কে. এম. আরিফ উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *