বিআইডব্লিউটিএ পরিচালক আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর ও পরিবহন বিভাগের পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন (আরিফ হাসনাত)-এর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ইতোমধ্যে এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপ প্রকাশের ঘটনায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করায় বিষয়টি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে অনিয়ম এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ছিল। অভিযোগকারীদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন এবং সেই সুযোগে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হন। সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি প্রশাসনের ভেতরে নিজের প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখে আগের মতোই নানা সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধান

অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধানে নামে। ২০২৩ সালের ৩ সেপ্টেম্বর দুদকের উপ-পরিচালক মো. হাফিজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে (স্মারক নং ০০.০১.২৬০০.৬০৩.০১.২৩৪.২৩-৩২১৭) বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক (প্রশাসন)-এর কাছে আরিফ উদ্দিনের চাকরি, আর্থিক লেনদেন এবং সম্পদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র চাওয়া হয়।

দুদকের চাহিদাপত্র অনুযায়ী যেসব তথ্য ও নথি চাওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—

  • নারায়ণগঞ্জ ও সদরঘাট বন্দরে দায়িত্ব পালনকালীন নির্দিষ্ট সময়ের ব্যাংক হিসাবের বিবরণ।
  • চাকরিজীবনের শুরু থেকে জুন ২০২৩ পর্যন্ত বেতন-ভাতা ও ব্যক্তিগত সার্ভিস রেকর্ড।
  • দায়িত্ব প্রদানসংক্রান্ত অফিস আদেশ।
  • তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও ভাইদের নামে ব্যবসা পরিচালনা বা কোম্পানির শেয়ার ধারণের অনুমতিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট নথি।

দুদকের এই অনুসন্ধানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, এসব নথি বিশ্লেষণের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বাস্তবতা যাচাই করা সম্ভব হবে।

অবৈধ সম্পদের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীনভাবে আরিফ উদ্দিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁর নামে বা পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে একটি বহুতল ভবন, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, পাবনা জেলায় বিপুল পরিমাণ জমি এবং বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংকে বড় অঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিট (এফডিআর) রয়েছে।

তবে এসব সম্পদের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়েও প্রশ্ন

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩ এবং ১৫ এপ্রিল ২০২৪ তারিখের বিভিন্ন স্মারকের আলোকে বিআইডব্লিউটিএর সাংগঠনিক কাঠামোয় ‘এস্টেট ও আইন’ বিভাগের পদ সৃষ্টি এবং পরিচালক পর্যায়ের সুযোগ-সুবিধা ভোগের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অর্থ বিভাগের আপত্তি ও সীমিত সম্মতি থাকা সত্ত্বেও কীভাবে পরিচালক পর্যায়ের সুবিধা প্রদান করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রশাসনিক বিধি-বিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন তারা।

ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে বিতর্ক

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে আরিফ উদ্দিনের আপত্তিকর ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর কাছে ওই ভিডিও সংরক্ষিত রয়েছে বলে দাবি করা হলেও এর সত্যতা, ধারণের সময়, স্থান কিংবা সম্পাদনার বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল কনটেন্টের ফরেনসিক যাচাই ছাড়া কোনো ভিডিওকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। ফলে এ বিষয়টিও তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগ অস্বীকার

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

এদিকে বিআইডব্লিউটিএ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহল, সুশাসনকর্মী এবং দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং প্রশাসনিক অনিয়মের দায়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা না মিললে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্মান পুনর্বহাল হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে এ বিষয়ে দুদক এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থাগুলোর অনুসন্ধানের ফলাফলের দিকেই সবার নজর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *