বিআরটিসি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে কোটি টাকা মাসোয়ারা নেওয়ার অভিযোগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত অর্থ নেওয়া, পদায়ন ও বদলিতে অনিয়ম এবং বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

অভিযোগে বলা হয়েছে, বিআরটিসির ২৪টি বাস ডিপোর ব্যবস্থাপকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ডিপোভেদে ১১ লাখ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ কোনো ভাউচার ছাড়াই নগদে নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

একজন ডিপো ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, মাসিক অর্থ না দিলে পদ হারানোর ভয় দেখানো হয়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় পরিচালন ব্যয় মেটাতে আগের বছর ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও চলতি সময়ে তা বাড়িয়ে ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকৃত ব্যয় এর তুলনায় অনেক কম। একইভাবে চেয়ারম্যানের কক্ষের সাজসজ্জার জন্য ৫৬ লাখ টাকা বরাদ্দের কথাও বলা হয়েছে। এর মধ্য থেকে ভাউচারের মাধ্যমে ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ডিপো থেকে চলাচলকারী বাসপ্রতি ১ হাজার টাকা করে চেয়ারম্যানের কথিত ব্যক্তিগত তহবিলের জন্য নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। ২৪টি ডিপো থেকে প্রতিদিন মোট ১০ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং মাসে প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ডিপোগুলোর কাউন্টার থেকেও বিভিন্ন অঙ্কের অর্থ নেওয়া হয়। কোনো কোনো ডিপো থেকে মাসে ৪০ হাজার থেকে ৫৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয় বলেও দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিআরটিসির দুটি ওয়ার্কশপ থেকে মাসে ১০ লাখ টাকা, ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি ট্রাক ডিপো থেকে যথাক্রমে ১১ লাখ ও ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং নয়টি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান থেকে মাসে ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব অর্থ আদায়ের কারণে বিভিন্ন ডিপোর চালক ও কর্মচারীদের বেতন সময়মতো দিতে সমস্যা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থের বিনিময়ে পছন্দের ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ ডিপোতে ব্যবস্থাপক হিসেবে পদায়নের অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিআরটিসির মতিঝিল বাস ডিপো থেকে হেড অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুপুরের খাবারের জন্য প্রতি মাসে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা ভাউচারের মাধ্যমে ব্যয় দেখানো হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থ ব্যয়ের প্রক্রিয়াটিও বিআরটিসির নিয়মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

আব্দুল লতিফ মোল্লার পারিবারিক ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়েও প্রতিবেদনে বিভিন্ন অভিযোগ করা হয়েছে। তাকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক নেতার জামাতা এবং তার পরিবারের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে কয়েকজনের বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে প্রতিবেদনে কোনো স্বাধীন নথি বা প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতি এবং পূর্বের কর্মস্থলে দুর্নীতির কারণে বরখাস্ত হওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। তবে বরখাস্তের কারণ বা সংশ্লিষ্ট সরকারি নথির বিস্তারিত তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)–এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি দপ্তরে দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ গুরুতর। দুর্নীতির অভিযোগ এলে তা যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন বলেও তিনি মত দেন।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের বক্তব্য হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধান করা হচ্ছে। বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

অন্যদিকে, আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য একাধিকবার ফোন করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে উত্থাপিত অর্থ নেওয়া, দুর্নীতি, পদায়ন ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা নির্ভরযোগ্য নথিপত্রের মাধ্যমে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *