অনলাইন ডেস্ক:
ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগসংক্রান্ত ২০২৩ সালের আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে করা আবেদন বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টে দুই বিচারপতির মধ্যে মতভেদ হয়েছে। পরে বিষয়টি প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে উপযুক্ত সংখ্যক বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।
বিচারপতি দীপংকর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। বেঞ্চের দুই বিচারপতির মতভেদের কারণে মামলাটি এখন প্রধান বিচারপতির বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ পর্যায়ে আদালত ২০২৩ সালের আইন বাতিল বা বহাল—কোনোটিই চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেনি।
শুনানিতে নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন বিচারপতি দীপংকর দত্ত। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন শুধু স্বাধীন হলেই হবে না, সেটি যে স্বাধীনভাবে কাজ করছে—তা দৃশ্যমানও হতে হবে। এ প্রসঙ্গেই তিনি ক্রিকেটের উদাহরণ টেনে বলেন, একটি দলের অধিনায়ক যদি আম্পায়ার নির্বাচন করেন এবং পরে সেই দল জয়ী হয়, তাহলে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত সঠিক হলেও তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়।
বিচারপতি দত্তের পর্যবেক্ষণের মূল বিষয় ছিল নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতার পাশাপাশি নিরপেক্ষতার দৃশ্যমানতা নিশ্চিত করা। তাঁর মতে, ২০২৩ সালের আইনে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে নিয়োগ কমিটিতে রাখার ফলে ওই কমিটিতে সরকারের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। তিনি এ ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা আবেদনকারীদের বক্তব্যের প্রাথমিক ভিত্তি রয়েছে বলেও মত দেন।
যে আইনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
ভারতের সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের কাঠামো ও কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০২৩ সালের আগে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে একটি কমিটির কথা বলেছিল। পরে সংসদ নতুন আইন প্রণয়ন করে সেই কাঠামো পরিবর্তন করে।
২০২৩ সালের আইনে প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রী মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে নিয়োগ কমিটিতে রাখা হয়। বর্তমানে ওই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী চেয়ারম্যান হিসেবে থাকেন; সঙ্গে থাকেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এই নিয়োগ কাঠামোর সাংবিধানিক বৈধতাই এখন সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
মামলাটির শুনানিতে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিষয়টিতে সংবিধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন জড়িত থাকায় সাংবিধানিক বেঞ্চে শুনানি প্রয়োজন। বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মা এ অবস্থানের সঙ্গে একমত হন। অন্যদিকে বিচারপতি দীপংকর দত্ত মনে করেন, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক নীতিগুলো নিয়ে বিদ্যমান বিচারিক নজির রয়েছে এবং মামলাটি দুই বিচারপতির বেঞ্চেও নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
২০২৩ সালের রায়ের প্রসঙ্গ
২০২৩ সালের মার্চে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বিষয়ে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণ করেছিল। সেই ব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে নিয়োগ কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল। তবে একই রায়ে আদালত জানিয়েছিল, সংসদ এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করলে সেই আইন কার্যকর হবে।
এরপর ২০২৩ সালের শেষ দিকে সংসদ নতুন আইন পাস করে। নতুন আইনে নিয়োগ কমিটির কাঠামো পরিবর্তন করা হয় এবং প্রধান বিচারপতির পরিবর্তে প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে রাখা হয়। ২০২৪ সালে এই নতুন আইনের অধীনেই জ্ঞানেশ কুমার ও সুখবীর সিং সান্ধুকে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে জ্ঞানেশ কুমার প্রধান নির্বাচন কমিশনার হন।
নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য
এদিকে নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশি গত ১০ মাসে কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন। এসব আপত্তির মধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন, নাম সংযোজন ও বাদ দেওয়া এবং নির্বাচনী তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বহুসদস্যের কমিশনে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং এসব মতামত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ার অংশ। কমিশনের দাবি, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তগুলো কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী নেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগ আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে শুনানি হয়েছে। ফলে আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং কমিশনের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য—দুই বিষয়ই নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সামনে সাংবিধানিক বেঞ্চ
দুই বিচারপতির মতভেদের পর এখন বিষয়টি ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের কাছে রয়েছে। তিনি মামলাটি কোন ধরনের সাংবিধানিক বেঞ্চে যাবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। আদালত একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্নের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্থায়ী পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ গঠনের সম্ভাবনাও বিবেচনা করতে প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেছে।
ফলে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের বর্তমান কাঠামো নিয়ে চূড়ান্ত সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত এখনো আসেনি। বৃহত্তর বেঞ্চেই নির্ধারিত হবে ২০২৩ সালের নিয়োগ আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।