ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে ট্রাম্পের বড় চুক্তি, রয়ে গেছে যেসব প্রশ্ন

অনলাইন ডেস্ক:

ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করে বড় একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি চুক্তিটিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ হিসেবে অভিহিত করলেও এর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো পরিষ্কার হয়নি। এমনকি চুক্তির পূর্ণাঙ্গ নথিও প্রকাশ করা হয়নি।

শুক্রবার রাতে চুক্তিটির ঘোষণা দেন ট্রাম্প। এতে ভেনেজুয়েলার ১৭টি তেলক্ষেত্র উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। এসব তেলক্ষেত্রে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুতের সম্ভাবনা রয়েছে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আওতায় দেশটির তেলশিল্পে ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ আসতে পারে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলা ২০৯ বিলিয়ন ডলারের বেশি কর রাজস্ব পেতে পারে।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার একটি বেসরকারি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে নতুন একটি কোম্পানি গঠন করেছে। এই কোম্পানিকে অনুন্নত তেলক্ষেত্রগুলোর অধিকার ১০০ বছরের জন্য দেওয়া হয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নতুন কোম্পানির কার্যকর উৎপাদনের ৫৫ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র পাবে। এর মধ্যে মালিকানার অংশীদারত্ব এবং উৎপাদন খরচে তেল কেনার অধিকার রয়েছে। তবে এই ৫৫ শতাংশের কতটা মালিকানার অংশ এবং কতটা তেল কেনার অধিকারের মাধ্যমে আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিনিয়োগ করবে কে?

চুক্তির অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো—তেলক্ষেত্র উন্নয়নে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেবে কে। ভেনেজুয়েলার তেল অবকাঠামো দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ। ফলে উৎপাদন বাড়াতে কয়েক বছর সময় এবং বিপুল অর্থের প্রয়োজন হতে পারে।

ট্রাম্প তেল উৎপাদন বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর কথা বললেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অল্প সময়ে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম।

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের এনার্জি, ক্লাইমেট জাস্টিস অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ল্যাবের পরিচালক অ্যামি মায়ার্স জ্যাফে বলেন, দীর্ঘমেয়াদে চুক্তিটি সহায়ক হতে পারে। তবে দ্রুত উৎপাদন বাড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা জ্বালানির দামে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।

ভেনেজুয়েলায় ক্ষোভ

চুক্তিটি নিয়ে ভেনেজুয়েলাতেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দেশটির অনেকের মতে, এতদিন সরকার বলে এসেছে—দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের মানুষের জন্য। ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে তেলসম্পদে প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হচ্ছে।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ভেনেজুয়েলার সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী রিকার্ডো হাউসমান চুক্তিটিকে ‘লজ্জাজনক চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন। তার দাবি, ভেনেজুয়েলার বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের চুক্তি করার বৈধতা নেই।

যুক্তরাষ্ট্রেও রাজনৈতিক বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রেও চুক্তিটি নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থকেরা এটিকে ঐতিহাসিক চুক্তি হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করেছেন, ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের পেছনে দেশটির তেলসম্পদ দখলের উদ্দেশ্য ছিল।

চুক্তির আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো অজানা। বেসরকারি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানটির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। অবকাঠামো উন্নয়নে কত অর্থ প্রয়োজন হবে এবং সেই অর্থ কে দেবে, সেটিও স্পষ্ট নয়। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্বের সঠিক কাঠামোও এখনো পরিষ্কার করা হয়নি।

ভেনেজুয়েলায় সক্রিয় একমাত্র মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরন এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। এক্সনমোবিলও কোনো মন্তব্য করেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তবে এত বড় বিনিয়োগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা কঠিন। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো ও বিনিয়োগের ঝুঁকির কারণে বড় মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এই খাতে কতটা আগ্রহ দেখাবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *