ভোর হতে না হতেই কক্সবাজারে জেগে ট্রাফিক পুলিশের চাঁদাবাজি

কামরুল ইসলাম:

কক্সবাজার শহরে ভোর হতে না হতেই ব্যস্ত হয়ে ওঠে সড়ক। বাস টার্মিনাল, লিংক রোড, লালদিঘীর পাড়, খুরুশকুল রাস্তার মোড়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে যায় নীল-সবুজ রঙের সিএনজি অটোরিকশা। যাত্রী ওঠানামার এই চেনা দৃশ্যের আড়ালে প্রতিদিনই চলে আরেক ধরনের লেনদেন—এমন অভিযোগ করেছেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি। তাদের ভাষ্য, এই লেনদেনের কোনো লিখিত হিসাব নেই; মুখে মুখে নির্ধারিত হয় মাসিক টাকার অঙ্ক। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ কাগজপত্র থাকা গাড়ির পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীন কিংবা অনুমোদনহীন যানবাহনকেও সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ করে দিতে বিভিন্ন নামে নিয়মিত টাকা আদায় করা হয়।

পরিবহনসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কক্সবাজারের সড়কজুড়ে গড়ে উঠেছে একটি বিস্তৃত ‘টোকেন’ ও মাসোহারা ব্যবস্থা। মাস শেষে একেকটি গাড়ির চালক বা মালিককে গুনতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। কারও কাছ থেকে নেওয়া হয় এক হাজার টাকা, আবার লাইসেন্সবিহীন বা কথিত ‘লাইনের’ আওতাভুক্ত গাড়ির ক্ষেত্রে নেওয়া হয় আরও বেশি। বিনিময়ে পাওয়া যায় সড়কে চলাচলের অলিখিত অনুমতি। অভিযোগকারীদের দাবি, এই ব্যবস্থার কারণে কাগজপত্রের বৈধতা অনেক ক্ষেত্রে গৌণ হয়ে পড়েছে; বরং নির্দিষ্ট লাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকাই যেন নির্বিঘ্নে চলাচলের প্রধান শর্ত।

শুধু কক্সবাজার শহর নয়, অভিযোগের বিস্তার টেকনাফ থেকে ঈদগাঁও এবং রামু থেকে কলাতলী পর্যন্ত। অনুসন্ধানে পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিএনজি অটোরিকশা, ডাম্পার, বাস, রেন্ট-এ-বাইক, টমটম-মিশুকসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবহনকে ঘিরে একাধিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব চক্র বিভিন্ন স্ট্যান্ড ও রুট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে নিয়মিত টাকা সংগ্রহ করে। পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত হিসাবে, বিভিন্ন খাতের টাকা একত্র করলে মাসে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিভিন্ন দালাল ও লাইনম্যানের মাধ্যমে সংগৃহীত টাকা প্রথমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছায়। পরে এর একটি অংশ ট্রাফিক পুলিশের কয়েকজন সদস্যের কাছে যায় বলে দাবি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ট্রাফিক ইনচার্জ (অ্যাডমিন) খসরু পারভেজের নামও উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ জুনিয়র সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয় এবং এর একটি অংশ ঊর্ধ্বতন পর্যায়েও পৌঁছে যায়। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার অন্তত ১০টি স্টেশন ও বিভিন্ন রুটকে ঘিরে একাধিক সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকার অভিযোগ রয়েছে। বৈধ প্রতিটি গাড়ি থেকে মাসে প্রায় এক হাজার টাকা এবং লাইসেন্সবিহীন গাড়ি থেকে এক হাজার ৮০০ থেকে দুই হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। পরিবহনসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, জেলায় প্রায় ১০ হাজার অবৈধ সিএনজি রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই খাত থেকেই মাসে কোটি টাকার মতো অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে ‘কোম্পানি’ নামে পরিচিত একটি সিন্ডিকেট থেকেই মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকা তোলার অভিযোগ করা হয়েছে।

টেকনাফ-শামলাপুর বিলকিস মার্কেট-সংলগ্ন স্ট্যান্ডেও প্রতি সিএনজি থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আমানুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে এই টাকা আদায় করেন আনোয়ার। একই ব্যক্তির অধীনে খরুলিয়া, লিংক রোড ও রামু এলাকায় সহস্রাধিক সিএনজি রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, হাইওয়ে পুলিশের নামে এসব গাড়ি থেকে আরও ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয়।

রামু এলাকায় সিএনজি সমিতির সভাপতি পরিচয়ে মমতাজ এবং সাধারণ সম্পাদক পরিচয়ে ভুট্টোর নামও উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অধীনে প্রায় সহস্রাধিক সিএনজি রয়েছে এবং প্রতিটি গাড়ি থেকে মাসে এক হাজার ৮০০ টাকা করে ট্রাফিক পুলিশের নামে আদায় করা হয়। ঈদগাঁও এলাকায় আজিমের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রায় হাজারখানেক সিএনজি থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা করে টাকা তোলা হয়।

অভিযোগের বিষয়ে রামু শাখার সিএনজি সমিতির সভাপতি পরিচয় দেওয়া মমতাজের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়। এক হাজার ৮০০ টাকা করে চাঁদা তোলার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা অভিযোগ করছে, তাদের নিয়ে আমার সামনে আসুন।’ তার দাবি, রামু-গর্জনিয়া, মরিচ্যা ও কক্সবাজার লাইন তার অধীনে রয়েছে এবং প্রতিদিন ২০ টাকা করে নেওয়া হয়। মমতাজের ভাষ্য অনুযায়ী, এই টাকা শুধু চাঁদা নয়; কোনো চালক দুর্ঘটনায় পড়লে তহবিল থেকে তাকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহযোগিতা করা হয়।

বিআরটিএর তথ্যের বরাত দিয়ে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২১ সালে জেলায় প্রায় সাত হাজার ৬০০টি অবৈধ সিএনজি ছিল। তাদের দাবি, প্রতিবছর গড়ে আরও প্রায় ৫০০টি করে অবৈধ গাড়ি যুক্ত হয়েছে। সে হিসাবে পাঁচ বছরে প্রায় দুই হাজার ৫০০টি গাড়ি যুক্ত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ী, এক হাজার গাড়ি থেকেও মাসে এক হাজার ৮০০ টাকা করে আদায় করা হলে অঙ্ক দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অর্থের একটি বড় অংশ হাইওয়ে ট্রাফিক পুলিশের সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌঁছে।

ডাম্পার পরিবহনেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। লিংক রোড এলাকায় নিয়মিত অবস্থান করে জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি প্রতি ডাম্পার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি শহরের প্রায় দুই হাজার অবৈধ ডাম্পার থেকে মাসে প্রায় তিন হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলেও পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দাবি। এই অর্থের বড় একটি অংশ খসরু পারভেজের কাছে পৌঁছায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরিচয় গোপন রেখে ছদ্মনাম ব্যবহার করে ফোনে কথা হয় জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। কথোপকথনের শুরুতেই তিনি গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে লাইন খরচ কিংবা নির্বিঘ্নে চলাচল নিয়ে দুশ্চিন্তার কারণ নেই বলে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি আগে গাড়ি কেনেন, লাইন খরচ ও নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য চিন্তা করতে হবে না। আমার সঙ্গে এসে দেখা করিয়েন।’ তার এই বক্তব্যকে পরিবহনসংশ্লিষ্টরা লাইনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

কলাতলী এলাকাতেও রেন্ট-এ-বাইক থেকে শুরু করে দূরপাল্লার বাস পর্যন্ত বিভিন্ন পরিবহনকে ঘিরে টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, কলাতলীর প্রায় ২০০টি অবৈধ রেন্ট-এ-বাইক থেকে দরিয়ানগরের আবছার ও কলাতলীর লাকী মিলে প্রায় এক লাখ টাকা তোলেন। দূরপাল্লার বাস থেকে মাসে প্রায় ছয় লাখ টাকা, চান্দের গাড়ি থেকে ৫০ হাজার, কলাতলী কার লাইন থেকে ৫০ হাজার এবং মিনিবাস থেকে ৫০ হাজার টাকা করে আদায় হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। শহরের অলিগলি ও বিভিন্ন মোড়ে চলাচলকারী প্রায় হাজারখানেক অনুমোদনহীন টমটম-মিশুক থেকেও নিয়মিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

পরিবহনসংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত হিসাব অনুযায়ী, শুধু শহরের ট্রাফিক পুলিশের নামে মাসে প্রায় ৩০ লাখ টাকা সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। জেলার হাইওয়ে ও উপশহর এলাকার বিভিন্ন খাত যুক্ত করলে এই অঙ্ক কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়ায় বলে তাদের দাবি। অভিযোগকারীদের ভাষায়, এতে একটি জেলার সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় নিয়মের পাশাপাশি একটি সমান্তরাল অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে, যেখানে নিয়মিত টাকা পরিশোধ করাকে অনেক চালক সড়কে চলাচলের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখছেন।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট হিসেবে স্থানীয়ভাবে ‘কোম্পানি’ নামে পরিচিত একটি চক্রের কথা উঠে এসেছে। দেবানল পাল ওরফে নিউটনের নেতৃত্বে এই চক্র পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দাবি, এই চক্রের নিয়ন্ত্রণে প্রায় দুই হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে শাহাবুদ্দিন, শাহাজাহান, শহিদুল্লাহ, ভূট্টো, আমান উল্লাহ, মমতাজ, ছালামতসহ আরও কয়েকজন এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

জেলার বিভিন্ন সড়ক ও রুটও কয়েকটি প্রভাবশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য থেকে দাবি করা হয়েছে। বাস টার্মিনাল থেকে রামু পর্যন্ত রুট শাহজাহানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তার অধীনে প্রায় এক হাজার অবৈধ সিএনজি চলাচল করে বলে অভিযোগ। লিংক রোড হয়ে মরিচ্যা, কোর্টবাজার ও উখিয়া পর্যন্ত রুট শহিদুলের ‘এ প্লাস’ সিন্ডিকেটের আওতায় রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের অধীনে ৮০০ থেকে ৯০০ সিএনজি রয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

কক্সবাজার-চকরিয়া রুটে ভুট্টো, আমান উল্লাহ ও মমতাজের অধীনে প্রায় এক হাজার গাড়ি রয়েছে বলে পরিবহনসংশ্লিষ্টদের দাবি। অন্যদিকে টেকনাফ-শামলাপুর করিডোরে আমানুল্লাহর নিয়ন্ত্রণে খরুলিয়া, লিংক রোড ও রামু মিলিয়ে সহস্রাধিক গাড়ি রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব অভিযোগ সত্য হলে শহর থেকে দূরবর্তী উপজেলা পর্যন্ত একই ধরনের একটি রুটভিত্তিক কাঠামো কার্যকর থাকার বিষয়টি সামনে আসে।

‘কোম্পানি’ সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে থাকার অভিযোগ থাকা দেবানল পাল ওরফে নিউটনের সঙ্গে টাকা নেওয়ার বিষয়ে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার না করে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমরা টাকা নিই। সব টাকা তো আমরা নিই না। ট্রাফিকের দায়িত্বে নিয়োজিত টিআই, টিএসআই, সার্জেন্টসহ অন্তত ২০ জন পুলিশকে ম্যানেজ করতে হয়।’

নিউটনের দাবি, অবৈধ গাড়ি শহরে প্রবেশ করলে ট্রাফিক পুলিশ আটক করে। এ কারণে আগে থেকেই টাকা দিয়ে রাখতে হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাহারছড়া এলাকার শাহাজান তার নিয়ন্ত্রিত টাকার ভাগে বসেছেন এবং নিজেও একটি লাইন পরিচালনা করছেন। তবে পুলিশ সদস্যদের ‘ম্যানেজ’ করার দায়িত্ব নিজের বলে দাবি করেন নিউটন। তার বক্তব্যে উঠে আসা এসব দাবি অবশ্য সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ নয়।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, আগে পুরো ট্রাফিক বিভাগকে ম্যানেজ করতে মাসে এককালীন পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা দিতে হতো। বর্তমানে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের সরাসরি মাসিক টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে বলে অভিযোগ। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, টিআইদের ৩০ হাজার এবং সার্জেন্ট ও টিএসআইদের ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে মাসে আড়াই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত দেওয়ার দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব দাবিরও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

তবে অভিযোগের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে সাধারণ চালকদের ওপর—এমন দাবি করেছেন একাধিক চালক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক চালক বলেন, কাগজপত্র সব ঠিক থাকলেও মাসিক চুক্তি না করলে রেহাই নেই। তার অভিযোগ, ট্রাফিক পুলিশ, বিশেষ করে খসরু স্যার, বিভিন্ন অজুহাতে হয়রানি করেন এবং শেষ পর্যন্ত মামলার জরিমানা দিতে হয়।

সরেজমিনে সড়কের চিত্রেও বৈষম্যের অভিযোগের কথা উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নম্বরবিহীন ডাম্পার, সিএনজি ও মিশুকসহ বিভিন্ন যানবাহন ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে চলাচল করলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো থামিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয় না। বিপরীতে দূরবর্তী এলাকা থেকে আসা কিংবা স্থানীয় ‘লাইনের’ সঙ্গে যুক্ত নয়—এমন গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র পরীক্ষা ও মামলা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন চালক। তাদের ভাষ্য, সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে কাগজপত্রের পাশাপাশি ‘লাইনের’ সঙ্গে সম্পর্ক থাকাটাই অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

দূরপাল্লার বাসও এই অভিযোগ থেকে বাদ যায়নি। কলাতলী জেলগেট সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন কোম্পানির বাস দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অধিকাংশ কোম্পানির নিজস্ব ডিপো থাকলেও গাড়ির সংখ্যা বেশি হলে সড়কের দুই পাশে রাখতে হয়। তখন ‘স্যারদের চা খরচ’ হিসেবে টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ। টাকা না দিলে বিভিন্ন ধরনের হয়রানি কিংবা মামলার মুখে পড়তে হয় বলেও দাবি করেছেন তারা।

সকাল সাড়ে সাতটার দিকে লিংক রোডের এক কোণে গাড়ি পরিষ্কার করছিলেন আলী আকবর। তার দুটি সিএনজি রয়েছে। একটি দিয়ে পরিবারের খরচ চলে, অন্যটি ভাড়ায় চালানো হয়। তার দাবি, দুটি গাড়ির জন্যই মাস শেষে ‘কোম্পানি’র নামে টাকা রাখতে হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একদিন বাস টার্মিনালের সামনে তার একটি গাড়ি থামানো হলে টিআই খসরুর সামনে তিনি শুধু বলেন, ‘কোম্পানির গাড়ি।’ এরপর আর কোনো প্রশ্ন করা হয়নি এবং গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া হয়। এই বক্তব্যও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দাবি হিসেবে বিবেচ্য।

খুরুশকুলের ফরিদের অভিজ্ঞতাও একই ধরনের অভিযোগের কথা সামনে আনে। তিনি জানান, একসময় শাহজাহানের অধীনে গাড়ি চালাতেন। বর্তমানে পুলিশের একজন সদস্যের সঙ্গে সরাসরি বোঝাপড়ার মাধ্যমে গাড়ি চালান বলে দাবি করেন তিনি। তার হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে এক হাজার ৮০০ টাকা নির্দিষ্ট করে রাখতে হয়। তিনি এটিকে ‘লাইসেন্স’ হিসেবে উল্লেখ করলেও কাগজে-কলমে এর কোনো ভিত্তি নেই বলেও স্বীকার করেন।

মনজুর নামের আরেক চালক জানান, দীর্ঘদিন প্রবাসে থাকার পর দেশে ফিরে স্বনির্ভর হওয়ার আশায় নিজের একটি সিএনজি কিনেছিলেন। কিন্তু সড়কে নামার পর তিনি ভিন্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হন। তার অভিযোগ, তার গাড়ি প্রায়ই আটকানো হয়, অথচ একই ধরনের অন্য গাড়ি নির্বিঘ্নে চলে যায়। পরে তিনি জানতে পারেন, কাগজপত্রের বাইরেও ‘লাইন খরচ’ নামে একটি মাসিক অর্থ দিতে হয়।

লালদিঘীর পাড়ের প্যানোয়া সড়কেও লাইসেন্সবিহীন সিএনজি চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ৭০টি সিএনজির লাইনের মধ্যে প্রায় ৪০টির লাইসেন্স নেই। এসব গাড়ি বাহারছড়া-শাপলাপুর রুটে এসআই জসিমের নামে চলাচল করে এবং মাসে দুই হাজার টাকা করে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, জসিম একসময় কক্সবাজার টুরিস্ট পুলিশে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে খাগড়াছড়িতে কর্মরত; তবুও তার নাম ব্যবহার করে এই লাইনের নিয়ন্ত্রণ চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক চালক অভিযোগ করেন, একবার কাগজপত্র দেখাতে সামান্য দেরি হওয়ায় খসরু পারভেজ তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন। অন্য এক চালকের অভিযোগ, কাগজপত্র সব ঠিক থাকলেও মাসিক চুক্তি না থাকলে নানা অজুহাতে হয়রানি ও মামলা করা হয়।

লিংক রোডের ডাম্পার চালকদের কাছ থেকেও নিয়মিত টাকা তোলার অভিযোগ রয়েছে। জাহাঙ্গীর নামের এক ব্যক্তি প্রতি ডাম্পার থেকে দেড় হাজার টাকা করে তোলেন বলে চালকদের অভিযোগ। জেলাজুড়ে প্রায় দুই হাজার অবৈধ ডাম্পার থেকে মাসে এক হাজার ৫০০ টাকা করে ওঠে এবং এই অর্থের বড় অংশ খসরু পারভেজের হিসাবে জমা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এই অর্থের প্রকৃত গন্তব্য সম্পর্কে স্বাধীন কোনো নথি বা প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে আসেনি।

মাসিক চুক্তির পাশাপাশি শহরের প্রধান সড়কের ভোলাবাবুর পেট্রোল পাম্পসংলগ্ন এলাকাতেও প্রতিদিন টাকা সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, একেকজন চালক গাড়ি থেকে নেমে লাইনের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছে ২০ থেকে ৪০ টাকা দেন। এরপর দেওয়া হয় সিরিয়াল। রাত বাড়লেও এই টাকা সংগ্রহের কার্যক্রম চলে গভীর রাত পর্যন্ত বলে অভিযোগ।

চালকদের দাবি, প্রতিটি গাড়ি থেকে প্রতিদিন ৪০ টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে ২০ টাকা ‘লাইন খরচ’ এবং আরও ২০ টাকা পৌরসভার খরচ হিসেবে নেওয়া হয় বলে তাদের ভাষ্য। টাকা সংগ্রহের সঙ্গে মোহাম্মদ বেলাল নামের এক লাইনম্যান জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করে বেলাল বলেন, ‘এটি লাইন খরচের টাকা। গাড়িগুলোকে সুশৃঙ্খলভাবে সিরিয়াল দিয়ে ২০ টাকা করে নিচ্ছি।’ এই ব্যবস্থার সরকারি অনুমোদন রয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা কয়েকজন মিলে করছি। চলতে হবে তো।’

টোকেন বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে সার্জেন্ট মাঈন উদ্দিন, সার্জেন্ট রোবায়েত, টিআই অ্যাডমিন খসরু পারভেজ এবং রেকার চালক সুকর্ণ দাশের বিরুদ্ধেও। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই তা অস্বীকার করেছেন। খসরু পারভেজ অভিযোগের বিষয়ে বলেন, ‘মাসোহারার বিষয়ে যদি কোনো তথ্য-প্রমাণ থাকে, নিউজ করে দেন।’

কক্সবাজার নাগরিক আন্দোলনের সদস্যসচিব এইচ এম নজরুল ইসলাম বলেন, ‘টিআই খসরুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় নানা ধরনের অভিযোগ শুনেছি। কক্সবাজারে প্রায় হাজারখানেক অবৈধ ডাম্পার চলে, কিন্তু একটি ডাম্পারও কখনো জরিমানা কিংবা জব্দ করতে দেখিনি।’ তিনি দ্রুত খসরু পারভেজকে কক্সবাজার থেকে প্রত্যাহারের দাবি জানান।

অভিযোগের বিষয়ে কক্সবাজার জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ট্রাফিক) দেবদূত মজুমদার বলেন, ‘ট্রাফিক পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ থাকলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিষয়টি আমি সিরিয়াসলি দেখছি এবং এসপি স্যারের সঙ্গেও বিষয়টি শেয়ার করছি।’

সব মিলিয়ে কক্সবাজারের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগে কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে—লাইসেন্সবিহীন ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল, রুটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, মাসিক ‘লাইন খরচ’, প্রতিদিনের টাকা আদায় এবং এসব অর্থের একটি অংশ ট্রাফিক পুলিশের সদস্যদের কাছে পৌঁছানোর অভিযোগ। তবে অভিযোগগুলোর সবকটির স্বাধীন প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

তারপরও পরিবহনসংশ্লিষ্ট চালকদের বক্তব্যে একটি অভিন্ন অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে—মাসিক টাকা না দিলে গাড়ি চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের ভাষ্য, চাঁদা বা ‘লাইন খরচ’ না দিলে মামলা, হয়রানি কিংবা গাড়ি বন্ধ করে দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক চালক নিয়মিত এই অর্থ দিতে বাধ্য হন বলে দাবি করছেন। তাদের কাছে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা।

কক্সবাজারের সড়কে প্রতিদিন হাজারো মানুষের যাতায়াত। সেই সড়ক ব্যবস্থায় আইন, লাইসেন্স ও ফিটনেসের পাশাপাশি যদি কোনো অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কাঠামো কার্যকর থাকে—এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্টরা। অভিযোগগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, অর্থের উৎস ও গন্তব্য শনাক্ত এবং বৈধ-অবৈধ সব যানবাহনের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগের মাধ্যমেই প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *