স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর পুরান ঢাকার বংশাল থানাধীন ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাজেদ সরদার রোডে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর সকল নিয়ম-কানুন উপেক্ষা করে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে প্রভাবশালী ব্যক্তি আমজাদ হোসেনের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, ক্ষমতার দাপটে তিনি রাজউকের আইন, বিধি ও নির্দেশনাকে প্রকাশ্যেই অমান্য করে যাচ্ছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, মাজেদ সরদার রোডের ৯২/২ নম্বর হোল্ডিংয়ে নির্মাণাধীন ভবনটি রাজউক অনুমোদিত নকশা ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC)-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভবনটির চারপাশে নির্ধারিত সেটব্যাক বা ফাঁকা জায়গা রাখার কোনো বালাই নেই। পাশের ভবনের সঙ্গে গা ঘেঁষে নির্মাণ করা হয়েছে দেয়াল, যেখানে এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা রাখা হয়নি।
আলো-বাতাস বন্ধ, বাড়ছে ঝুঁকি
এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভবনটি এভাবে নির্মাণের ফলে আশপাশের বাড়িগুলোতে আলো-বাতাস চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প বা অন্য যেকোনো দুর্ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সেটব্যাক ছাড়া বহুতল ভবন নির্মাণ চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
একাধিক বাসিন্দা জানান, নিয়ম অনুযায়ী ভবনের চারদিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ খালি জায়গা রাখা বাধ্যতামূলক হলেও আমজাদ হোসেন তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছেন। স্থানীয়দের ভাষায়, “এটা শুধু নিয়মভঙ্গ নয়, এটি এলাকাবাসীর জীবনের সঙ্গে খেলার শামিল।”
অভিযোগের পর রাজউকের নাটকীয় অভিযান
স্থানীয়রা জানান, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার রাজউকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগের পর এক পর্যায়ে রাজউকের একটি টিম ঘটনাস্থলে আসে এবং আংশিকভাবে নির্মাণকাজ ভাঙচুর করে। কিন্তু সেই অভিযান ছিল খুবই সীমিত ও দায়সারা ধরনের। কিছু অংশ ভাঙার পরই তারা চলে যান।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, ওই অভিযানের পরও ভবন নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়নি। কয়েকদিনের মধ্যেই আবার পুরোদমে কাজ শুরু হয়। পরে রাজউকের কর্মকর্তারা আবার এলাকা পরিদর্শনে এলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়েই ফিরে যান।
৫/৩ বিধির তোয়াক্কা নেই
এলাকাবাসীর দাবি, ভবনটি রাজউকের ৫/৩ ধারার আওতাধীন হলেও মালিকপক্ষ তা মানছেন না। রাজউকের বিধিমালা অনুযায়ী, এই ধরনের অনিয়মের ক্ষেত্রে নির্মাণ বন্ধ, জরিমানা কিংবা ভবন সিলগালার মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—রাজউকের অনুমোদন ছাড়া বা নিয়ম ভেঙে এভাবে দিনের পর দিন বহুতল ভবন কীভাবে নির্মাণ হয়? তাহলে রাজউকের ভূমিকা কোথায়?
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী
এলাকাবাসীর মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন,
“রাজউক যদি শুধু এসে দেখে চলে যায়, তাহলে অভিযোগ দিয়ে আমাদের লাভ কী? সাধারণ মানুষের জন্য কি কোনো আইন নেই?”
আরেক বাসিন্দা বলেন,
“সাধারণ কেউ হলে এতদিনে পুরো ভবন ভেঙে ফেলত। কিন্তু এখানে প্রভাবশালী বলে সবকিছুই ম্যানেজ হয়ে যাচ্ছে।”
প্রশ্নের মুখে রাজউক
এই ঘটনায় রাজউকের ভূমিকা নিয়েও উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের চাপে রাজউকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। নিয়মবহির্ভূত নির্মাণ বন্ধে রাজউক কেন কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না—তা নিয়ে জনমনে সন্দেহ দানা বাঁধছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এভাবে নিয়ম লঙ্ঘনের সুযোগ দিলে ভবিষ্যতে পুরান ঢাকা আরও ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে।
অভিযুক্তের বক্তব্য নেই
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আমজাদ হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তার পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়াও পাওয়া যায়নি।
এখন এলাকাবাসীর একটাই প্রশ্ন—রাজউক কি সত্যিই আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে, নাকি প্রভাবশালীদের কাছে নিয়ম-কানুন বারবার পরাজিত হবে?
এই ঘটনায় দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।