এইচ এম হাকিমঃ
বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের একটি উন্নয়নশীল দেশ। স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও আজও কৃষি কিংবা শিল্পে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে। বিশাল এক জনগোষ্ঠী বেকার। এদের মধ্যে অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিত রয়েছে। বেকারত্বের মূল কারণ কর্মশক্তির সিংহভাগের কারিগরি দক্ষতা নেই। যাদের কারিগরি দক্ষতা আছে, তাদের জন্যও যোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা সরকারি-বেসরকারি মিলে শতক ছাড়িয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে সরকারি পর্যায়ে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত মেধাবী বের হচ্ছে, তাদেরও প্রয়োজনের তুলনায় যোগ্য কর্মসংস্থান নেই। ফলে বিপুল সংখ্যক প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী অনেকটা বাধ্য হয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় উন্নত জীবন-জীবিকার অন্বেষণে। একে আমরা বলি মেধা পাচার।
দেশের উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে মেধা পাচার বা ব্রেইন ড্রেইনকে সাধারণত নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হলেও বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে এর অত্যন্ত উজ্জ্বল ও ইতিবাচক দিক রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও কাঠামোগত পরিবর্তনে আমূল ভূমিকা রাখতে পারে। ঐতিহাসিকভাবে মেধা পাচার বলতে মেধাবী জনশক্তির দেশত্যাগ বোঝানো হলেও আধুনিক অর্থনীতিতে একে ব্রেইন সার্কুলেশন বা মেধার আবর্তন হিসেবে গণ্য করা হয়, যেখানে একজন মেধাবী প্রবাসী বিশ্বের উন্নত দেশে কাজ করে তার জ্ঞান, দক্ষতা এবং অর্জিত অর্থ পরোক্ষভাবে নিজ দেশের সমৃদ্ধিতেই বিলিয়ে দেন।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সুফল হলো রেমিট্যান্স প্রবাহ, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করে। কারণ উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ পেশাজীবীরা বিদেশে সাধারণ শ্রমিকের তুলনায় অনেক বেশি আয় করেন এবং সেই অর্থের বড় অংশ দেশে পাঠিয়ে বিনিয়োগ ও অভ্যন্তরীণ বাজারকে চাঙ্গা রাখেন।
এর পাশাপাশি জ্ঞান ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কর্মরত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী বা গবেষকরা যখন আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি বা করপোরেট হাউসে কাজ করেন, তখন তারা বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হন এবং সেই অভিজ্ঞতা তারা বিভিন্ন সেমিনার, অনলাইন মেন্টরশিপ বা সরাসরি দেশে ফিরে আসার মাধ্যমে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছড়িয়ে দেন, যা আমাদের স্থানীয় শিল্পের মানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উন্নীত করে।
মেধা পাচারের ফলে তৈরি হওয়া এই শক্তিশালী বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক দেশের জন্য একটি সফট পাওয়ার হিসেবে কাজ করে, যেখানে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন জাতিসংঘ বা বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা প্রবাসী মেধাবীরা দেশের স্বার্থে নীতিনির্ধারণী প্রভাব খাটাতে পারেন এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহিত করেন।
এ ছাড়া বিদেশে পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার গড়ার এই তীব্র প্রতিযোগিতা দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে কঠোর পরিশ্রম ও মানোন্নয়নের একটি সংস্কৃতি তৈরি করে, যা পরোক্ষভাবে দেশের মানবসম্পদ বিকাশে সহায়ক হয়। যখন একজন বাংলাদেশি মেধাবী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় কোনো সাফল্য অর্জন করেন, তখন তা দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশের মেধার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পায়, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের কর্মসংস্থান ও ব্র্যান্ডিংকে ত্বরান্বিত করে।
এই ইতিবাচক ধারার আরেকটি বড় দিক হলো বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় প্রজন্মের সাফল্য, যারা বড় হয়ে সেই দেশের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জায়গা করে নেন এবং জন্মভূমির সঙ্গে তাদের শিকড়ের টান বজায় রেখে বড় ধরনের প্রকল্প বা বৈদেশিক সহায়তার পথ প্রশস্ত করেন।
মেধাবীরা যখন বিদেশে গিয়ে বড় বড় স্টার্টআপ বা টেক জায়ান্টে নেতৃত্ব দেন, তখন তারা দেশের সফটওয়্যার ও আউটসোর্সিং খাতের জন্য বিশাল বাজার তৈরি করেন, যা আমাদের দেশের শিক্ষিত বেকারদের ঘরে বসে ডলার উপার্জনের সুযোগ করে দেয়।
অনেক সময় দেখা যায়, বিদেশে স্থায়ী হওয়া উচ্চশিক্ষিতরা তাদের অর্জিত সম্পদ দিয়ে দেশে হাসপাতাল, স্কুল বা গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করছেন, যা সরাসরি সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। এছাড়া বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া মেধাবীরা যখন গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন তত্ত্ব বা আবিষ্কারের জন্ম দেন, তখন সেই মেধা বৈশ্বিক সম্পত্তি হলেও তার কৃতিত্বের ভাগীদার হয় নিজ মাতৃভূমি, যা আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।
মেধা পাচারের মাধ্যমে তৈরি হওয়া এই গ্লোবাল ডায়াসপোরা বা প্রবাসী জনগোষ্ঠী দেশের দুর্যোগকালীন সময়ে বা অর্থনৈতিক সংকটে ত্রাতার ভূমিকা পালন করে, যা আমরা করোনাকালীন সময়ে রেমিট্যান্সের উচ্চ প্রবাহের মাধ্যমে দেখেছি।
আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে এই প্রবাসীরা এখন দেশে না ফিরেও ভার্চুয়ালি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান করছেন, যা দেশের তরুণদের গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে দক্ষ করে তুলছে। তাই মেধা পাচারকে সংকীর্ণভাবে মেধার মৃত্যু না ভেবে একে যদি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়, তবে এর মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা, প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং কূটনৈতিক সুবিধা অর্জিত হয়, তা দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অভাবনীয় গতি সঞ্চার করে।
মেধাবীদের এই বহির্গমন আসলে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশের মেধার জয়গান যাওয়ার একটি সুযোগ, যা শেষ পর্যন্ত মেধার আবর্তনের মাধ্যমে ফিরে এসে দেশের সামগ্রিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই ও শক্তিশালী করে তোলে।
এই প্রক্রিয়ায় মেধাবীরা বিদেশে কাজ করে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন, তা দেশের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসনে এবং আধুনিক প্রশাসনিক কাঠামো গঠনেও পরোক্ষ পরামর্শক হিসেবে কাজ করে, যা একটি স্মার্ট ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে অপরিহার্য।
চূড়ান্তভাবে বলা যায় যে, মেধা পাচার আসলে কোনো অপচয় নয়; বরং এটি একটি কৌশলগত বিস্তার, যা বিশ্বজুড়ে দেশের মেধার পদচিহ্ন এঁকে দিয়ে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি আরও মজবুত করে এবং দেশকে একটি সম্মানজনক বৈশ্বিক অবস্থানে আসীন করে।