যাত্রাবাড়ীতে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিকদের পথসভা, সরকারের কাছে ১০ দফা দাবি

স্টাফ রিপোর্টার:

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা, নিরাপদ সড়ক চলাচল, সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থা এবং এই পরিবহন ব্যবস্থাকে একটি আইনগত কাঠামোর আওতায় পরিচালনার দাবিতে যাত্রাবাড়ীতে পথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পথসভা থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে ১০ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়।

পথসভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের যাত্রাবাড়ী থানা কমিটির সভাপতি সাইদুল মোল্লা। প্রধান অতিথি ছিলেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এস এম আবু বকর। বিশেষ অতিথি ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক। এ সময় ঢাকা মহানগর কমিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

পথসভায় সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধ না করে আধুনিকায়ন, নিবন্ধন, ফিটনেস, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদানসহ একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অটোরিকশা মালিক ও শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা এবং দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

পথসভা থেকে সরকারের কাছে যে ১০ দফা দাবি উপস্থাপন করা হয়, সেগুলো হলো—

দাবি নং-১: বুয়েটের ডিজাইন অনুযায়ী রিকশার আধুনিকায়ন ও ফিটনেস সার্টিফিকেশন।

বর্তমানে অটোরিকশা বন্ধের মূল কারণ হিসেবে এর ব্রেকিং সিস্টেম ও অনিরাপদ বডি স্ট্রাকচারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর অনুমোদিত আধুনিক ব্রেকিং ও নিরাপদ ডিজাইনের ই-রিকশা আমদানি নয়, বরং দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নির্দিষ্ট উৎপাদন কর দিয়ে বা স্থানীয়ভাবে তৈরি করা হোক। দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চূড়ান্ত সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে এসব যানবাহনকে সড়কে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি পূর্বের গাড়িগুলো পরিবর্তন বা রূপান্তরের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা হিসেবে ৩ থেকে ৫ বছর সময় দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

দাবি নং-২: বাণিজ্যিক লাইসেন্স ও জোনভিত্তিক রুট পারমিট।

অটোরিকশাকে পুরোপুরি অবৈধ না রেখে সিটি কর্পোরেশন বা বিআরটিএর মাধ্যমে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনভিত্তিক লাইসেন্স ও রুট পারমিট দেওয়ার দাবি জানানো হয়। এতে সরকারের রাজস্ব বাড়বে এবং চালকরাও আত্মসম্মানের সঙ্গে ও আইনি ঝামেলা ছাড়া জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন বলে সংগঠনের পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে গাড়িগুলোর জন্য নিবন্ধন ফি নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।

দাবি নং-৩: চালকদের জন্য ট্রাফিক প্রশিক্ষণ ও বিশেষ ড্রাইভিং লাইসেন্স।

সড়ক দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্যে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকদের জন্য বিআরটিএ বা সিটি কর্পোরেশনের অধীনে ট্রাফিক নিয়মাবলি বিষয়ে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়। প্রশিক্ষণ কোর্স সফলভাবে সম্পন্নকারীদের জন্যই কেবল ড্রাইভিং লাইসেন্স বা স্মার্ট কার্ড ইস্যু করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

দাবি নং-৪: প্রতিটি গ্যারেজে ডি-৩ ক্যাটাগরিতে বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা।

প্রতিটি গ্যারেজে বিদ্যুৎ লাইনে প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে ডি-৩ ক্যাটাগরিতে চার্জিং স্টেশন চালুর দাবি জানানো হয়েছে। স্মার্ট প্রিপেইড মিটারিং এবং বিদ্যুৎ অপচয় ও অপসংযোগ রোধে অটোরিকশার গ্যারেজগুলোতে ডেসকো ও ডিপিডিসির মাধ্যমে ডি-৩ ক্যাটাগরির রেটে ‘স্মার্ট প্রিপেইড মিটার’ দেওয়া বাধ্যতামূলক করার দাবি করা হয়।

দাবি নং-৫: গ্যারেজ থেকে সরকারের বিদ্যুতের যথাযথ রাজস্ব আদায় ও বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করা।

গ্যারেজগুলো থেকে সরকারের বিদ্যুতের যথাযথ রাজস্ব আদায় এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, চালকরা যদি বৈধভাবে টাকা দিয়ে চার্জ দেওয়ার নিশ্চয়তা পান, তাহলে সরকারের বিদ্যুৎ চুরি বন্ধ হবে এবং বিদ্যুৎ বিভাগ লাভবান হবে।

এ ছাড়া ব্যাটারি প্রযুক্তির আধুনিকায়নের দাবিও জানানো হয়েছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে এমন সস্তা অ্যাসিড ব্যাটারির পরিবর্তে পর্যায়ক্রমে হালকা, দীর্ঘস্থায়ী ও দ্রুত চার্জ হওয়া লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যবহারে চালকদের উৎসাহিত করার দাবি করা হয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এ ধরনের ব্যাটারি সহজলভ্য করার ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, লিথিয়াম ব্যাটারি চার্জ হতে কম বিদ্যুৎ খরচ হয় এবং এটি পরিবেশবান্ধব। তাদের মতে, এ ব্যবস্থা গ্রিন এনার্জি ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

দাবি নং-৬: সিটি কর্পোরেশনের প্রধান সড়কে পৃথক ‘লো-স্পিড লেন’ নির্ধারণ।

সিটি কর্পোরেশন এলাকার ভেতরে তীব্র গণপরিবহন সংকট দূর করতে এবং প্রধান সড়কগুলোতে শৃঙ্খলা ফেরাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ঢাকার ভেতরের প্রধান সড়কগুলোর বাম পাশে ব্যারিকেড বা মার্কিংয়ের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ‘ধীরগতির যান্ত্রিক লেন’ বা লো-স্পিড লেন অথবা সার্ভিস লেন তৈরির প্রস্তাব করা হয়।

সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, পুরো সড়কে এমন ব্যবস্থা করা সম্ভব না হলে প্রধান সড়কের যেসব অংশ দিয়ে অটোরিকশাকে এক অভ্যন্তরীণ এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে হয়, সেসব স্থানে নির্দিষ্ট ক্রসিং বা ওভারপাস পয়েন্ট নির্ধারণ করা যেতে পারে। এতে প্রধান সড়কের দ্রুতগামী যানবাহনের চলাচলে বাধা সৃষ্টি হবে না এবং অটোরিকশাগুলোও দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমিয়ে শহরের অভ্যন্তরে মূল সড়কের বাম পাশ ব্যবহার করে চলাচল করতে পারবে।

দাবি নং-৭: জাতীয় মহাসড়কের সঙ্গে সংযুক্ত ঢাকা সিটির প্রধান সড়কের বাম পাশে স্থায়ী ডিভাইডার দিয়ে অটোরিকশার জন্য আলাদা লেন নির্ধারণ।

ঢাকা শহরের হাইওয়ে-সংযুক্ত প্রধান সড়কগুলোর মধ্যে গাবতলী, যাত্রাবাড়ী ও উত্তরাসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় সড়কের একেবারে বাম পাশে হলুদ রঙের প্লাস্টিক বা কংক্রিটের ছোট ছোট বর্ডার বা ফিজিক্যাল ডিভাইডার দিয়ে ৭ থেকে ৮ ফুটের একটি ডেডিকেটেড লোকাল লেন তৈরির দাবি জানানো হয়।

সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই লেনের মধ্য দিয়ে অটোরিকশাগুলো হাইওয়ের দ্রুতগামী বাস বা অন্যান্য যানবাহনের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটিয়ে নিরাপদে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াত করতে পারবে।

দাবি নং-৮: পরিবহন ব্যবস্থার আইনি কাঠামোয় অটোরিকশাকে সংযুক্ত করা।

অটোরিকশাকে সড়ক পরিবহন আইনের অধীনে এনে সিটি কর্পোরেশন বা বিআরটিএ এবং স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরির দাবি জানানো হয়েছে। ওই আইনের অধীনে প্রতিটি রিকশার সরকারি নিবন্ধন এবং চালকের লাইসেন্স থাকার ব্যবস্থা করার দাবি করা হয়।

একই সঙ্গে কোনো অটোরিকশা ট্রাফিক আইন অমান্য করলে বা উল্টো পথে চললে সাধারণ বাস কিংবা ব্যক্তিগত গাড়ির মতোই তাদের বিরুদ্ধে বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের নিয়মিত মামলা ও জরিমানার আইনি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের এলাকায় যেন সিটির বাইরের কোনো গাড়ি প্রবেশ করতে না পারে, সে বিষয়েও শক্ত আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।

দাবি নং-৯: ৮ জোন বাতিল করে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে বিভক্ত করা এবং ৫ লাখ অটোরিকশার সিলিং নির্ধারণ।

ঢাকা মহানগরীকে জটিল ৮টি ভৌগোলিক জোনে ভাগ করার পরিবর্তে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)—এই দুটি আইনি ও প্রশাসনিক অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট করার দাবি জানানো হয়েছে।

সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, জটিল জোন ব্যবস্থার কারণে সাধারণ যাত্রীদের যাতায়াত এবং চালকদের রুট ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হতে পারে। এ কারণে বুয়েট ও বিআরটিএর রোড ক্যাপাসিটি এবং ২ কোটি ৫০ লাখ থেকে ৩ কোটি মানুষের অভ্যন্তরীণ ট্রিপের চাহিদা বিবেচনা করে শহরের ফিডার রোড বা অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং প্রধান সড়কের নির্দিষ্ট লো-স্পিড লেন মিলিয়ে সারাদেশের মেগাসিটিগুলোর ট্রাফিক মডেল অনুযায়ী ঢাকায় সর্বমোট ৫ লাখ অটোরিকশার চূড়ান্ত লাইসেন্স বা সিলিং নির্ধারণের দাবি করা হয়েছে।

দাবি নং-১০: সড়ক ব্যবস্থাপনায় মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ।

অটোরিকশা শ্রমিকদের ওপর সকল প্রকার শোষণ, নিপীড়ন, জুলুম, চাঁদাবাজি এবং অযথা ‘ডাম্পিং’ নামক হয়রানি বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা কমিটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি করা হয়।

এ ছাড়া সংগঠনগুলোকে আইনি প্রক্রিয়ায় ট্রেড ইউনিয়ন বা অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে নিবন্ধন দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক ও মানবিক দিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পুঁজিকে নিরাপদ করে পর্যায়ক্রমে প্যাডেলচালিত যানবাহনের অমানবিক শ্রম থেকে মানুষকে মুক্ত করারও দাবি জানানো হয়।

পথসভায় বক্তারা বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে পুরোপুরি বন্ধ না করে আধুনিকায়ন, নিবন্ধন, ফিটনেস, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, নির্দিষ্ট রুট এবং পৃথক লেনের মাধ্যমে একটি সুশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থার আওতায় আনা সম্ভব। এ বিষয়ে সরকার সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারা।

সংগঠনের পক্ষ থেকে উপস্থাপনকারী:
ঢাকা মহানগর ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *