রাত নামলেই মাটি কাটার মহোৎসব! সরাইলে নদীভাঙনের আতঙ্কে আজবপুরের শতাধিক পরিবার

মো. বাদশা মিয়া:

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার চুন্টা ইউনিয়নের আজবপুর গ্রামে রাতের আঁধারে ফসলি জমি ও নদীতীর থেকে অবৈধভাবে মাটি কাটার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র বড় আকারের স্টিলের নৌকা (বাল্কহেড) ব্যবহার করে নদীতীর ও আবাদি জমি থেকে বিপুল পরিমাণ মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় সরবরাহ করছে। এতে একদিকে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে কৃষিজমি, বসতভিটা ও জীবিকা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন শতাধিক পরিবার।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দিনের বেলায় এলাকায় তেমন কোনো তৎপরতা চোখে না পড়লেও রাত গভীর হলেই শুরু হয় মাটি কাটার কার্যক্রম। অভিযোগ রয়েছে, ভারী যন্ত্রপাতি ও বাল্কহেডের মাধ্যমে নদীতীর এবং ফসলি জমি থেকে মাটি উত্তোলন করে দ্রুত অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। রাতভর চলা এ কার্যক্রমের কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে।

গ্রামবাসীর অভিযোগ, সরকার নদীভাঙন রোধে বিভিন্ন সময় জিও ব্যাগ ফেলে নদীতীর সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলেও অবৈধ মাটি কাটার কারণে সেই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। তাদের ভাষ্য, বাল্কহেড চলাচলের ফলে সৃষ্ট বড় বড় ঢেউ নদীতীরকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। এতে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্থানে ভাঙন দেখা দিচ্ছে এবং নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মূল্যবান কৃষিজমি।

এলাকার একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অবৈধ মাটি কাটার প্রতিবাদ করলে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের রোষানলে পড়তে হয়। ভয়ভীতি ও বিভিন্ন ধরনের হুমকির কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। তাদের দাবি, প্রশাসনের নিয়মিত নজরদারির অভাবকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট চক্র।

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, কৃষিকাজই তাদের প্রধান এবং অনেকের ক্ষেত্রে একমাত্র জীবিকার উৎস। কিন্তু নির্বিচারে মাটি কেটে নেওয়ায় জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও জমির বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় তারা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন বন্ধ করা না গেলে শুধু কৃষিজমিই নয়, সরকারের নদী সংরক্ষণ প্রকল্পও হুমকির মুখে পড়বে। পাশাপাশি নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাদের মতে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী বর্ষা মৌসুমে আজবপুর এলাকায় আরও ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিতে পারে।

এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ফলে অবৈধ মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে বলে তাদের দাবি।

এ বিষয়ে সরাইল উপজেলা প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন এলাকাবাসী। একই সঙ্গে অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে অবৈধ মাটি কাটার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

তবে এ বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তীতে প্রকাশ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *