মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জ শহরে বহুল আলোচিত দুটি নির্মাণ প্রকল্প—১নং রেলগেট এলাকায় মার্কেট নির্মাণ এবং খানপুরে কন্টেইনার পোর্ট স্থাপন—বন্ধের দাবিতে সরব হয়েছে স্থানীয় নাগরিক সমাজ। এ বিষয়ে রবিবার (১৯ এপ্রিল) সকালে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলনের পক্ষ থেকে একটি প্রতিনিধিদল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) প্রশাসক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খানের কাছে একটি লিখিত আবেদন জমা দেয়।
সংগঠনের আহ্বায়ক রফিউর রাব্বির নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলে আরও উপস্থিত ছিলেন ভবানী শংকর রায়, অ্যাডভোকেট জাহিদুল হক দীপু, রীনা আহমেদ, হাফিজুল ইসলাম, আবুনাইম খান বিপ্লব এবং ধীমান সাহা জুয়েল। তারা চিঠিতে দুটি প্রকল্পের আইনগত, সামাজিক ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ঝুঁকির দিক তুলে ধরে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানান।
চিঠিতে ১নং রেলগেট এলাকার মার্কেট নির্মাণ প্রসঙ্গে বলা হয়, রেলওয়ের জায়গা দখল করে একটি অসাধু চক্র বাণিজ্যিক মার্কেট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। অভিযোগ করা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রটি সরকারি জমি আত্মসাতের চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ২০১২ সালে তৎকালীন সংসদ সদস্য নাসিম ওসমানের সমর্থনে প্রথম এই মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে সে সময় বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের তীব্র আন্দোলনের মুখে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আন্দোলন চলাকালে গোলাগুলি ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের মতো সহিংস ঘটনাও ঘটে।
পরবর্তীতে তৎকালীন রেলমন্ত্রী এবং রেলওয়ের মহাপরিচালক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মার্কেট নির্মাণ বন্ধের ঘোষণা দেন। এরপরও ২০২২ সালে পুনরায় একই চক্র সক্রিয় হয়ে উঠলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দায়ের করে নির্মাণকাজ বন্ধের আবেদন জানায়। একই সঙ্গে নাগরিক কমিটিও পৃথকভাবে রিট করে। আদালতের নির্দেশে প্রকল্পটির ওপর স্থগিতাদেশ জারি হয়, যা চলতি মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত বহাল রয়েছে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই আদালতের নির্দেশ অমান্য করেই সম্প্রতি আবারও নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে।
চিঠিতে নাগরিক নেতারা উল্লেখ করেন, নারায়ণগঞ্জে প্রয়োজনীয় জনকল্যাণমূলক অবকাঠামোর ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের বিতর্কিত বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তারা বলেন, শহরে এখনো মানসম্মত মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অডিটোরিয়াম ও সংস্কৃতি কমপ্লেক্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা গড়ে তোলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গার অভাব রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারি জমি দখল করে মার্কেট নির্মাণকে তারা “অগ্রহণযোগ্য” বলে অভিহিত করেন।
অন্যদিকে খানপুরে প্রস্তাবিত কন্টেইনার পোর্ট প্রকল্প নিয়েও তীব্র আপত্তি জানানো হয় চিঠিতে। নাগরিক কমিটির দাবি, বিগত সময়ে উন্নয়নের নামে যেসব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে, তার অনেকগুলোই জনস্বার্থের চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থ ও অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। খানপুরের কন্টেইনার পোর্টকে তেমন একটি প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
তারা যুক্তি দেন, নারায়ণগঞ্জে ইতোমধ্যে পানগাঁও কন্টেইনার টার্মিনাল রয়েছে, যা দীর্ঘদিন ধরেই অপ্রতুল ব্যবহারের কারণে প্রায় অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। তাদের দাবি, ওই টার্মিনালের ২০ শতাংশ সক্ষমতাও বর্তমানে ব্যবহার করা হয় না। চলতি বছরের শুরুতে সেটিকে সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, নতুন করে আরেকটি পোর্ট নির্মাণের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিকরা।
এছাড়া খানপুরে নতুন কন্টেইনার পোর্ট নির্মিত হলে শহরের যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ইতোমধ্যে প্রকল্পটির ব্যয় বাড়িয়ে ১৮৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৭ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা নিয়ে স্বচ্ছতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সবশেষে, নারায়ণগঞ্জ শহরকে বাসযোগ্য রাখতে এবং ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনা সুরক্ষিত করতে এই দুটি প্রকল্প অবিলম্বে বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নাসিক প্রশাসকের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।
নাগরিক সমাজের এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে শহরজুড়ে আলোচনা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং বিতর্কিত এই প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ কোন দিকে গড়ায়।