শশী হাসপাতাল ঘিরে মালিকানা ও অর্থ পাচারের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর চামেলিবাগের শশী হাসপাতাল ঘিরে মালিকানা, অর্থের উৎস, আর্থিক লেনদেন, আয় গোপন, অবৈধ সম্পদ অর্জন ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের লাইসেন্সে যাদের নাম রয়েছে, প্রকৃতপক্ষে তারা হাসপাতালের মালিক কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট একজন সাবেক কর্মচারী। অভিযোগগুলোর তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।

গত ৩০ আগস্ট দেওয়া ওই আবেদনে হাসপাতালের মালিকানা, বিনিয়োগের অর্থের উৎস, আয়-ব্যয়ের হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, করসংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

লাইসেন্সে চারজনের নাম, প্রকৃত মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন

আবেদনে বলা হয়েছে, শশী হাসপাতালের লাইসেন্সে মিঠু দাস, রেখা রানী দাস, লিটন দাস ও মদন দাস—এই চারজনের নাম রয়েছে। তবে অভিযোগকারী নাজনীন সুলতানার দাবি, লাইসেন্সে নাম থাকা ব্যক্তিরা হাসপাতালের প্রকৃত মালিক নন। হাসপাতাল পরিচালনায় ডা. এস এম শহীদুল ইসলাম ও সজীব শেখের ভূমিকা রয়েছে বলেও আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

হাসপাতালটিতে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিপুল অর্থের উৎস কী এবং লাইসেন্সে থাকা ব্যক্তিদের আর্থিক সক্ষমতা ওই বিনিয়োগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—তা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে হাসপাতালের মালিকানা কাঠামো, বিনিয়োগের উৎস এবং পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকৃত ভূমিকা নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারী।

আয় গোপন ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ

শশী হাসপাতালের প্রকৃত আয় গোপন করার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, হাসপাতালের রোগী নিবন্ধন, চিকিৎসাসেবা, প্যাথলজি ও অন্যান্য সেবা থেকে অর্জিত আয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ বা প্রদর্শন করা হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন।

এ জন্য হাসপাতালের রোগীর নিবন্ধন খাতা, মানি রিসিট, প্যাথলজি বিভাগের আয়, চিকিৎসাসেবা থেকে পাওয়া অর্থ, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন এবং সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, হাসপাতালের আয় বা অর্থের কোনো অংশ কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ

আবেদনে ডা. এস এম শহীদুল ইসলামের সঙ্গে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও তোলা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, ডা. শহীদুল ইসলাম সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে তাঁর বাসায় যাতায়াত করতেন এবং চীন সফরে দোভাষী হিসেবেও ছিলেন।

এ সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সরকারি সফরের নথি, সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র এবং ইমিগ্রেশন রেকর্ড পরীক্ষা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৯ সালে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সুপারিশে ডা. শহীদুল ইসলাম বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) পেয়েছেন বলেও আবেদনে দাবি করা হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন ছবি ও নথি সংরক্ষিত থাকার কথাও জানিয়েছেন অভিযোগকারী। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।

সরকারি চাকরি থেকে ‘লিয়েন’ নিয়ে হাসপাতালে কাজের অভিযোগ

ডা. শহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি থেকে ‘লিয়েন’ নিয়ে শশী হাসপাতালে কাজ করার অভিযোগও রয়েছে আবেদনে। এ ক্ষেত্রে তিনি কী পদে, কী শর্তে এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করেছেন—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে সিলেটের একটি কোম্পানির প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এবং চীনকেন্দ্রিক ব্যবসার মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মালিকানা, আর্থিক লেনদেন, ব্যাংক হিসাব, কর নথি এবং বিদেশি লেনদেনের তথ্য যাচাই প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

সজীব শেখের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে পরিচিত সজীব শেখের বিরুদ্ধেও বিদেশে যাতায়াত এবং অর্থ পাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের নথি বা প্রমাণ রয়েছে এবং অভিযোগগুলোর আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

ফাউন্ডেশনে অনুদানের অভিযোগ

আবেদনে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের ছেলে শাফি মুদ্দাসির খান জ্যোতির একটি ফাউন্ডেশনে ডা. এস এম শহীদুল ইসলামের বিপুল অর্থ অনুদান দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

এই অর্থের উৎস, অনুদানের পরিমাণ, লেনদেনের মাধ্যম এবং সংশ্লিষ্ট ফাউন্ডেশনের আর্থিক নথি যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।

শত কোটি টাকার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত দাবি

শশী হাসপাতালকে কেন্দ্র করে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে বিনিয়োগের অর্থ, হাসপাতালের আয়-ব্যয়, সম্পদ, ব্যাংক লেনদেন, বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের বিষয় রয়েছে।

অভিযোগকারী এসব বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে হাসপাতালের প্রকৃত মালিকানা, লাইসেন্সে থাকা ব্যক্তিদের আর্থিক সক্ষমতা, বিনিয়োগের উৎস এবং হাসপাতালের আয়-ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

তদন্তে যেসব নথি যাচাইয়ের দাবি

অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হাসপাতালের লাইসেন্স ও মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র, বিনিয়োগের উৎস, ব্যাংক হিসাব, আয়কর রিটার্ন, রোগীর নিবন্ধন, মানি রিসিট, প্যাথলজি ও চিকিৎসাসেবার আয়-ব্যয়ের হিসাব, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ বিবরণী এবং বিদেশে যাতায়াত ও অর্থ লেনদেনের নথি যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদ, ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং লাইসেন্সে থাকা ব্যক্তিদের প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কেও তদন্তের দাবি উঠেছে।

বক্তব্য পাওয়া যায়নি

অভিযোগগুলোর বিষয়ে ডা. এস এম শহীদুল ইসলাম, সজীব শেখসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশের সময় তা পাওয়া যায়নি।

তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁদের অবস্থান গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *