শুরু হলো মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের দৃশ্যমান কাজ

আব্দুর রহমান:

অবশেষে দৃশ্যমান হতে চলেছে ১৮ কোটি মানুষের বহুল কাঙ্ক্ষিত মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। দেশের সমুদ্রবাণিজ্যের চেহারা পাল্টে দেওয়ার লক্ষ্যে গৃহীত মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরের জেটি ও টার্মিনাল নির্মাণের কাজ গতকাল শুরু হয়েছে। মহেশখালীর ১ হাজার ৩০ একর জায়গায় বহুল প্রত্যাশার মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হচ্ছে। পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

রবিবার (৩ মে) থেকে এই নির্মাণযজ্ঞ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। ৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি জেটির সমন্বয়ে একটি টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। জাপান থেকে আনা বিশালাকারের বিশেষায়িত একটি ড্রেজার দিয়ে ড্রেজিং শুরুর মাধ্যমে এই কর্মযজ্ঞের সূচনা হতে যাচ্ছে। চ্যানেল থেকে ২৫ কোটি ঘনফুটের বেশি মাটি ও বালি উত্তোলন করা হবে, যা দিয়ে প্রকল্প এলাকা ভরাট করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য বেশ কিছু মাটি সংরক্ষণ করা হবে। ২০২৯ সালে প্রকল্পের কাজ শেষ এবং ২০৩০ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে এই গভীর সমুদ্রবন্দর পরিচালিত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বন্দর অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হচ্ছে আজ রোববার। জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে জেটি এবং টার্মিনাল নির্মাণকাজ শুরু করছে জাপানি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পেন্টা-ওশান এবং টোয়া কর্পোরেশন। বিশাল এই প্রকল্পের প্রথম ধাপে ৬ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে দুটি জেটি, টার্মিনাল এবং ব্যাকইয়ার্ড ফ্যাসিলিটি গড়ে তোলা হবে। প্রতিষ্ঠান দুটি যৌথভাবে আগামী ৪ বছরের মধ্যে ৪৬০ মিটার দীর্ঘ একটি কন্টেইনার জেটি এবং ৩০০ মিটার দীর্ঘ মাল্টিপারপাস জেটি নির্মাণ করবে। দুটি জেটির জন্য সমন্বিতভাবে নির্মাণ করা হবে ব্যাকআপ ফ্যাসিলিটিসহ একটি টার্মিনাল। আজ সকালে মাতারবাড়িতে এই কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এই কাজের জন্য জাপান থেকে আনা হয়েছে বিশালাকারের একটি বিশেষায়িত ড্রেজার, যেটি মাতারবাড়িতে নির্মিত কৃত্রিম চ্যানেল থেকে ৭২ লাখ ঘনমিটার বা ২৫ কোটি ৪৩ লাখ ঘনফুট মাটি ও বালি উত্তোলন করবে।

সূত্র জানায়, জাপানের আর্থিক সহায়তায় মাতারবাড়িতে ১২০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল) এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করছে। ১২০০ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে প্রতিদিন ১০ হাজার টন কয়লা পোড়ানো হয়। দুই মাসের প্রয়োজনীয় অন্তত ৬ লাখ টন কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে মজুদ রাখতে হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রয়োজনীয় জ্বালানির যোগান দিতে বিদেশ থেকে প্রতি মাসে অন্তত তিন লাখ টন কয়লা আমদানি করতে হয়। একেকটি জাহাজে ৬০ হাজার টন কয়লা পরিবহন করলেও মাসে অন্তত ৫টি মাদার ভ্যাসেল এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য হ্যান্ডলিং করতে হচ্ছে।

মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং কয়লা আমদানির পথঘাট তৈরি করতে ১৪.৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ২৫০ মিটার প্রস্থের ১৬ মিটার গভীর একটি চ্যানেল তৈরি করা হয়। কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য যে চ্যানেলটি তৈরি করা হয়েছে সেটিকে পাশে ১০০ মিটার বাড়িয়ে ৩৫০ মিটার করা হয়েছে। নির্মিত চ্যানেল ও হারবার নিরাপদ ও সুরক্ষিত করার জন্য সিপিজিসিবিএল কর্তৃক ১৭৫৩ মিটার উত্তর ব্রেকওয়াটার, ৭১৩ মিটার দক্ষিণ ব্রেকওয়াটার এবং উত্তর দিকে ১৮০২.৮৫ মিটার রিভেটমেন্ট নির্মাণ করা হয়। ২০১৮ সাল থেকে এসব কার্যক্রম শুরু হয়।

এই প্রকল্পে সর্বমোট ২৪ হাজার ৩৮১ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এর মধ্যে টার্মিনাল ও দুটি জেটি নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ৬ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা। এই ব্যয়ের পুরো অর্থের যোগান দিচ্ছে জাইকা। দুটি জেটির এই টার্মিনালে একইসাথে বড় আকৃতির তিনটি, মাঝারি আকৃতির চারটি মাদার ভ্যাসেল বার্থিং দেওয়া যাবে।

বন্দর সূত্র জানায়, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হলে ১৪ মিটার ড্রাফটের বিশালাকারের কন্টেইনার কিংবা কার্গো জাহাজ ভিড়ানো সম্ভব হবে। জোয়ার–ভাটার বাধা না থাকায় এই চ্যানেলটিতে রাত–দিন চব্বিশ ঘণ্টা জাহাজ ভিড়ানোর সুবিধা রয়েছে উল্লেখ করে তারা বলেন, গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে বাংলাদেশের যে সীমাবদ্ধতা ছিল, মাতারবাড়ি তা পুরোপুরি কাটিয়ে দিতে যাচ্ছে। এক লাখ টন ধারণক্ষমতার কার্গো জাহাজ কিংবা ৮–১০ হাজার টিইইউএস কন্টেইনার বহনকারী জাহাজ ভিড়ানো শুরু করা হলে পণ্য পরিবহন খরচ বহুলাংশে কমে যাবে। ইতোমধ্যে একটি সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরে ২০২৯ সালে ১১ লাখ এবং ২০৪১ সালে ২৬ লাখ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা যাবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, গত বছরের এপ্রিল মাসে জাপানি প্রতিষ্ঠান দুটির সাথে চুক্তি হয়েছিল। বেশ আগেই জাপান থেকে আনা হয়েছিল ড্রেজার। কিন্তু আনুষাঙ্গিক প্রস্তুতি এবং অন্যান্য প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে অবশেষে গতকাল থেকে মাতারবাড়িতে টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বিশাল এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে এটি একটি বড় অগ্রগতি বলে বন্দরের কর্মকর্তারা মন্তব্য করেছেন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, প্যাকেজ–১ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দরে ২০২৯ সালে ১১ লাখ এবং ২০৪১ সালে ২৬ লাখ টিইইউএস কন্টেইনার হ্যান্ডলিং করা সম্ভব হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে নির্ধারিত ১ম জেটি ও টার্মিনালের কাজ শেষ করে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালনার আশা রেখেই দ্রুত কাজ শেষ করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছি। আশা করি নির্ধারিত সময়েই আমরা কাজ শেষ করতে পারব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *