মোঃ ইসলাম উদ্দিন তালুকদার :
দেশের বিভিন্ন সরকারি অফিস-আদালতে দীর্ঘদিন ধরে কিছু কথিত সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সরকারি দপ্তর এখন নিয়মিত সিসিটিভির পাশাপাশি গোপন কলম ক্যামেরা (Pen Camera) ব্যবহার শুরু করেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ দাবি বা চাঁদাবাজির অভিযোগের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্দেশ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিদিন বিভিন্ন সরকারি অফিসে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি সংবাদকর্মীদেরও যাতায়াত থাকে। অধিকাংশ সাংবাদিক দায়িত্বশীল ও পেশাদার হলেও, অভিযোগ রয়েছে—কিছু অসাধু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা, এমনকি এর চেয়েও বেশি অর্থ দাবি করেন।
এ ধরনের অভিযোগের পর অনেক সরকারি দপ্তর নিজেদের নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ আইনি প্রক্রিয়ার স্বার্থে গোপনে ভিডিও ধারণের ব্যবস্থা করেছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এটি কোনো ব্যক্তি বা সাংবাদিক পেশাকে লক্ষ্য করে নয়; বরং অপরাধ সংঘটিত হলে তার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সংরক্ষণের একটি ব্যবস্থা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি সরকারি দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন,
“আমাদের অফিসে মাঝেমধ্যেই কিছু কথিত সংবাদকর্মী আসেন। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকেন এবং ১০০-২০০ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে মানহানিকর সংবাদ প্রকাশের হুমকি দেন। অনেক সময় পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজের বেতন থেকেই টাকা দিতে হয়েছে। তবে এখন আমরা গোপন ক্যামেরায় এসব ঘটনা ধারণ করি, যাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আইনগতভাবে প্রমাণ উপস্থাপন করা যায়।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কেউ যদি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজির চেষ্টা করেন, তাহলে সেই ভিডিও আদালতে উপস্থাপন করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।”
এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা বলেন, প্রকৃত সাংবাদিকতার সঙ্গে চাঁদাবাজির কোনো সম্পর্ক নেই। সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের দায়িত্ব জনগণের স্বার্থে, ব্যক্তিগত লাভের জন্য নয়। সংবাদ প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও পেশাগত আদর্শের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
তাদের মতে, কয়েকজন অসাধু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের কারণে পুরো সাংবাদিক সমাজের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। তাই সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন, যাতে প্রকৃত সাংবাদিকদের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অক্ষুণ্ন থাকে।
সচেতন মহলের অভিমত, সৎ উপায়ে জীবিকা অর্জনের বিকল্প নেই। কেউ আর্থিক সংকটে থাকলে বৈধ ও পরিশ্রমনির্ভর যে কোনো পেশায় যুক্ত হয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবিকা নির্বাহ করতে পারেন। সাংবাদিকতার মতো দায়িত্বশীল পেশাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের চেষ্টা শুধু আইনগত অপরাধই নয়, এটি গণমাধ্যমের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাংবাদিক পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকতার মর্যাদা রক্ষায় প্রকৃত সাংবাদিক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, যাতে সাংবাদিকতার আড়ালে কোনো ব্যক্তি চাঁদাবাজি বা অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে।