সচিব-অধ্যাপক সন্তানের মা আট দিন ধরে পচলেন একা!

মোঃআনজার শাহ :

কোরবানির ঈদ এসেছিল। গরু জবাই হয়েছিল। হাসি-আনন্দে ভরে উঠেছিল চারদিক। কিন্তু মিরপুরের একটি পরিত্যক্ত ঘরে তখন নিঃশব্দে পচে যাচ্ছিলেন এক বৃদ্ধা মা। তাঁর নাম নুরজাহান। বয়স ৭৫। জীবনের সবটুকু উজাড় করে যে সন্তানদের সচিব-অধ্যাপক বানিয়েছিলেন, সেই সন্তানেরা ঈদের আট দিনেও একবার মায়ের দরজায় কড়া নাড়াননি।

যেভাবে জানা গেল মর্মান্তিক সত্য,

ঈদুল আযহার চার দিন আগেই মারা গিয়েছিলেন নুরজাহান। মেয়ের বাড়ির এক অগোছালো পরিত্যক্ত কক্ষে একা শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন তিনি। বয়সের ভারে ক্লান্ত শরীরে ঘরটি গোছানোর শক্তিও হয়তো আর ছিল না।

ঈদ এল, কোরবানি হলো, রান্না হলো, খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। কিন্তু কেউ একবারও মায়ের ঘরের দিকে ফিরে তাকালেন না। মৃত্যুর আট দিন পর লাশ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। ভেতরে দেখা গেল ভয়াবহ দৃশ্য। মেঝেতে পড়ে আছেন নুরজাহান। তাঁর দেহে ইতিমধ্যে পচন ধরে গেছে।

যে মা নিজেকে নিঃশেষ করে দিয়েছিলেন,

প্রতিবেশীরা জানান, নুরজাহান ছিলেন অসম্ভব পরিশ্রমী ও পরায়ণ একজন মা। সংসারের প্রতিটি কঠিন বাঁকে নিজেকে আড়াল রেখে সন্তানদের সামনে এগিয়ে দিয়েছেন। নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে একে একে গড়ে তুলেছেন চার সন্তানকে।

সেই পরিশ্রম বৃথা যায়নি। এক ছেলে হয়েছিলেন সরকারের সচিব। আরেক ছেলে হয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তৃতীয় ছেলে পাড়ি জমিয়েছিলেন কানাডায়। মেয়েও হয়েছিলেন সুশিক্ষিতা। সেদিন এই মা বুক ভরা গর্বে চোখের জল ফেলেছিলেন।

সেই গর্বিত মায়ের শেষ পরিণতি হলো পরিত্যক্ত ঘরে একা মরে পচে যাওয়া।

ঈদের দিনগুলোতে মায়ের কথা মনে পড়েনি,

এলাকাবাসী প্রশ্ন তুলছেন, ঈদের এতগুলো দিনে কি একবারও মনে পড়েনি সেই মায়ের কথা? কোরবানির গোশত ভাগ করার সময় কি মাথায় আসেনি যে ৭৫ বছরের বৃদ্ধা মা একা পড়ে আছেন একটি পরিত্যক্ত ঘরে?

এক প্রতিবেশী কাঁদতে কাঁদতে বললেন, উনি সবসময় ছেলেমেয়েদের নিয়ে গর্ব করতেন। বলতেন আমার ছেলে সচিব, আমার ছেলে ভার্সিটিতে পড়ায়। আজ সেই মায়ের এই পরিণতি দেখে বুকটা ভেঙে যাচ্ছে।

আরেকজন প্রতিবেশী ক্ষোভের সাথে বললেন, উচ্চশিক্ষা মানুষকে বড় পদ দেয়, কিন্তু মানবিকতা না থাকলে সেই শিক্ষার কোনো মূল্য নেই। এই সন্তানেরা পদ-পদবিতে বড় হয়েছেন, কিন্তু মানুষ হতে পারেননি।

সমাজের বুকে গভীর ক্ষত,

ঘটনাটি প্রকাশ পাওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে তীব্র ক্ষোভ ও বেদনার ঢেউ উঠেছে। লক্ষ মানুষ চোখের জল ফেলছেন। প্রশ্ন উঠছে, কোন পথে হাঁটছে এই সমাজ?

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, নগরায়ণ ও আধুনিকতার নামে আমরা পারিবারিক বন্ধন থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছি। বৃদ্ধ মা-বাবাকে বোঝা ভাবার এক ভয়ঙ্কর প্রবণতা সমাজে শিকড় গেড়ে বসছে। নুরজাহানের এই নিঃসঙ্গ মৃত্যু সেই ভয়াবহ বাস্তবতারই করুণ প্রতিচ্ছবি।

আইনি ব্যবস্থার দাবি,

স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি অবগত হয়েছে। সচেতন নাগরিক ও সমাজকর্মীরা দাবি তুলেছেন, পিতামাতার ভরণপোষণ আইন ২০১৩ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সন্তানদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। এই ধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক বিচার না হলে সমাজে এই অবক্ষয় আরও গভীর হবে বলে তাঁরা সতর্ক করেছেন।

পাঠকের প্রতি,

নুরজাহান চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর এই নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের প্রত্যেকের বুকে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে।

আপনার বাড়িতে কি একজন বৃদ্ধ মা বা বাবা আছেন? আজ কি তাঁর সাথে একটু কথা বলেছেন? একটু খোঁজ নিয়েছেন?

সময় থাকতে নিন। কারণ পচন ধরে গেলে আর ফেরানো যায় না।

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন প্রতিটি মা-বাবাকে রহমতের চাদরে আবৃত রাখুন। আমিন।