সত্যের সন্ধানে নাকি ভাইরালের দৌড়ে  বর্তমান সাংবাদিকতার বাস্তবতা ও দায়িত্ব: আনজার শাহ 

 

বর্তমান সাংবাদিকতা সমাজের দর্পণ হওয়ার বদলে কি এখন কেবল ভাইরালের দৌড়ে লিপ্ত? তথ্যপ্রযুক্তির ক্রমোন্নতিতে সংবাদ মানুষের কাছে পৌঁছতে এখন ঘণ্টা বা দিন নয়, কয়েক মিনিটই লাগে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে খবর ছড়াতে সময়ের এমন দ্রুতগতির সুবিধা থাকলেও সেটি একই সঙ্গে খবর যাচাই-বাছাই ও নৈতিকতা সম্পর্কে বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। দ্রুততা যখন মূল হয়ে যায়, তখন ‘আগে প্রকাশ, পরে যাচাই’ এমন প্রবণতা ঘটছে, এবং এতে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ণ হয়।

একটি সংবাদ আজকে কতটা চমকপ্রদ শিরোনাম পাবে, কত দ্রুত ভাইরাল হবে বা কত ক্লিক আনবে—এসব কথাই অনেক সময় সংবাদ নির্বাচনের পেছনে বড় প্রভাব ফেলে। কিন্তু সাংবাদিকতার মূল্যায়ন কেবল ভিউ, লাইক বা শেয়ারে সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত না। একটি খবরের প্রকৃত পরিমাপক হতে হবে তার সত্যতা, নিরপেক্ষতা, তথ্যভিত্তিকতা এবং জনস্বার্থ। ভুয়া বা অসম্পূর্ণ সংবাদ একজন ব্যক্তির সম্মানহানি ছাড়াও একটি পরিবারের, একটি সংস্থার, এমনকি বৃহত্তর সমাজের উপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সব মিডিয়া বা সব সাংবাদিককে একই চশমায় দেখা অনুচিত। অসংখ্য সাংবাদিক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সততা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে সত্য অনুসন্ধান করছেন, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে আনছেন। তাদেরই সাহস ও নিষ্ঠাই আজও মানুষের আস্থা ধরে রেখেছে। তাই প্রশ্নটা রয়ে যায়—আমরা কি সত্যকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি, নাকি ভাইরাল হওয়াকেই সফলতার মানদণ্ড হিসেবে ধরছি?
একজন দায়িত্বশীল সাংবাদিকের কাছে গতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সত্যতা আরও গুরুত্বপূর্ণ। একটি সংবাদ প্রকাশের আগে একাধিক উৎসে যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, প্রাসঙ্গিক প্রমাণ উপস্থাপন এবং প্রয়োজনে ভুল বুঝে তা দ্রুত সংশোধন—এসবই সাংবাদিকতার নৈতিক ভিত্তি। তথ্য যাচাই না করে প্রকাশিত খবর কেবল রকমারি শোরগোল তুলবে, কিন্তু সমাজে মূল্যবান কোনো পরিবর্তন আনবে না; বরং আস্থার নষ্টি ঘটাবে।

ডিজিটাল সাংবাদিকতার যুগে তাই দায়িত্বশীলতার বিকল্প নেই। সংবাদকর্মীকে যাচাইপ্রক্রিয়াকে কখনো তুচ্ছ করে দেখা যাবে না; সংবাদকে জনস্বার্থের দিকে পরিচালিত করতে হবে, ব্যক্তিগত কৌতূহল বা উত্তেজনা উসকানোর জন্য নয়। সাংবাদিকতা কোনো ব্যক্তিকে খুশি করা বা কড়া মন্তব্য করে কাউকে হেয় করার মাধ্যম নয়। এটির মূল লক্ষ্য হলো সত্যকে সামনে আনা এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

প্রযুক্তি বদলবে, সংবাদপ্রকাশের মাধ্যম বদলাবে, পাঠকপ্রিয়তার সূচক বদলাবে কিন্তু সত্যের প্রতি সাংবাদিকদের দায়বদ্ধতা কখনও বদলানো যাবে না। ভুল হলে তা স্বীকার করার সাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা এবং ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে জনস্বার্থকে মান্যতা দেওয়াই একজন সাংবাদিকের প্রকৃত পরিচয়।

শেষ কথা,মানুষ এমন সাংবাদিকতাই চায় যা শোরগোলের ভেতর থেকেও সত্যকে খুঁজে বের করবে; ভাইরালের পেছনে ছুটে না গিয়ে মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সত্যের পক্ষে দাঁড়াবে। সাংবাদিকতার শক্তি তার শব্দের উচ্চতায় নয়, সত্যের গভীরতায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *