সরকারি নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়নে ধীরগতি লোকসানের মুখে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক শিল্প

আব্দুল আজিজ আল মাক্কী:

পরিবেশদূষণ রোধ ও কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি রক্ষায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সনাতন পদ্ধতির পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারের এ উদ্যোগে আশাবাদী হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আধুনিক কংক্রিট ব্লক তৈরির কারখানা স্থাপন করেন উদ্যোক্তারা। কিন্তু নির্দেশনা জারির কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এর কার্যকর বাস্তবায়ন না হওয়ায় বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তারা এখন বড় ধরনের আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পরিবেশ সুরক্ষা এবং কৃষিজমির মাটি সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০২১ সাল থেকে সরকারি উন্নয়নমূলক কাজে পর্যায়ক্রমে সনাতন পদ্ধতির পোড়ানো ইটের পরিবর্তে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে সরকারি নির্মাণকাজে শতভাগ কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল। এ সিদ্ধান্তকে পরিবেশবান্ধব নির্মাণশিল্পের জন্য একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে দেখেছিলেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

সরকারের এই উদ্যোগে আস্থা রেখে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের বারদোনা এলাকায় গড়ে ওঠে ‘শাহ মজিদিয়া কংক্রিট ব্লক ফ্যাক্টরি’। আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতিনির্ভর এ কারখানা স্থাপনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়। উদ্যোক্তারা নিজেদের সঞ্চিত অর্থের পাশাপাশি ব্যাংকঋণ নিয়েও এ শিল্পে বিনিয়োগ করেন। তাঁদের প্রত্যাশা ছিল, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়লে এ শিল্পের বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

কিন্তু উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বাস্তবে সরকারি নির্দেশনার প্রত্যাশিত প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে এখনো প্রচলিত পোড়ানো ইটের ব্যবহার অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি অবৈধ সনাতন ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ না হওয়ায় পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লকের বাজার প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্প্রসারিত হচ্ছে না। ফলে আধুনিক প্রযুক্তিতে ব্লক উৎপাদন করেও সেগুলো বিক্রি করতে পারছেন না অনেক কারখানার মালিক।

কারখানাগুলোতে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ কংক্রিট ব্লক অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে থাকছে। এতে একদিকে উৎপাদন ও সংরক্ষণ ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে বিনিয়োগ করা অর্থ দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকছে। নিয়মিত ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধ, বিদ্যুৎ বিল, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন এবং কারখানার অন্যান্য পরিচালন ব্যয় মেটাতে গিয়ে আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা।

সাতকানিয়ার বারদোনা এলাকার শাহ মজিদিয়া কংক্রিট ব্লক ফ্যাক্টরিসহ এ খাতের উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকারের পরিবেশবান্ধব নীতির ওপর আস্থা রেখেই তাঁরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলোতে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর উদ্যোগ, তদারকি ও জবাবদিহির অভাবে তাঁদের বিনিয়োগ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক উদ্যোক্তার পক্ষে কারখানার কার্যক্রম চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।

উদ্যোক্তারা আরও জানান, পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লক শিল্পের বিকাশ শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ, কৃষিজমির উর্বরতা রক্ষা এবং টেকসই নির্মাণব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ও জড়িত। প্রচলিত ইট তৈরিতে কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি ব্যবহার এবং ইটভাটার ধোঁয়া ও দূষণ পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে কংক্রিট ব্লকের ব্যবহার বাড়লে এসব ক্ষতিকর প্রভাব কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ অবস্থায় উদ্যোক্তারা সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশবান্ধব কংক্রিট ব্লকের ব্যবহারসংক্রান্ত নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, সরকারি নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প বাস্তবায়নকারী দপ্তরগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, সরকারি নির্দেশনার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব নির্মাণশিল্পের প্রসার ঘটবে, অন্যদিকে বিনিয়োগকারী উদ্যোক্তারাও বর্তমান লোকসানের পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবেন। তা না হলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পে বিনিয়োগকারী অনেক উদ্যোক্তার পুঁজি হারানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগও সংকুচিত হতে পারে।

পরিবেশ সুরক্ষা, কৃষিজমি রক্ষা এবং দেশীয় পরিবেশবান্ধব শিল্পের বিকাশের স্বার্থে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন ও উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ভুক্তভোগী উদ্যোক্তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *