মোঃআনজার শাহ
টানা ১৬৮ ঘণ্টা পুরো সাতটি দিন। অসুস্থ এক বৃদ্ধা মায়ের একটিবার খোঁজ নেননি তাঁর কোনো সন্তান। একাকী, একটি আবদ্ধ কক্ষে নিথর পড়েছিলেন ৭৩ বছর বয়সী নূরজাহান বেগম। শেষ পর্যন্ত লাশ পচে-গলে শরীর থেকে মাংস খসে পড়েছে বিছানায়।
অথচ এই বৃদ্ধার এক সন্তান বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব এবং একটি প্রভাবশালী অধিদপ্তরের প্রধান। আরেক ছেলে দেশের সর্বোচ্চ প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ বুয়েটের শিক্ষক। মেয়ের স্বামীও একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। মৃত বৃদ্ধার প্রয়াত স্বামী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, যিনি প্রায় পাঁচ বছর আগে মারা গেছেন। সমাজের দৃষ্টিতে এই পরিবারটি সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত ও সম্মানিত।
পাশের ঘরে মেয়ে, তবু সাত দিন খোঁজ নেই
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, নূরজাহান বেগম অসুস্থ অবস্থায় তাঁর নিজের কক্ষে একা পড়েছিলেন। একই বাড়িতে থাকা তাঁর মেয়ে দীর্ঘ সাত দিনেও মায়ের ঘরে একবারও যাননি। মায়ের মুখে এক ফোঁটা জল তুলে দেননি কেউ। শেষ নিঃশ্বাসের মুহূর্তে কপালে হাত রেখে পাশে থাকেননি কোনো সন্তান।
অবশেষে যখন সন্ধান মেলে, ততক্ষণে বৃদ্ধার দেহ পচন ধরেছে এবং বিছানায় মাংস খসে পড়ার মতো ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়েছে।
পুলিশের ধারণা: মেয়ের মানসিক সমস্যা থাকতে পারে
পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, মেয়ের মানসিক সমস্যা না থাকলে পাশের ঘরে থেকেও সাত দিন মায়ের কোনো খোঁজ না নেওয়া সম্ভব নয়। তবে প্রশ্ন উঠছে দূরে থাকা ছেলেরাও কেন একটিবার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি?
সূত্র জানায়, মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে শিক্ষক ছেলে ঘটনাস্থলে এলেও, যুগ্মসচিব পদে আসীন অপর সন্তান মায়ের গলিত মুখটি শেষবারের মতো দেখতেও আসেননি।
সমাজের আয়নায় এক নির্মম প্রতিচ্ছবি
নূরজাহান বেগমের এই মৃত্যু কেবল একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। উচ্চশিক্ষা, সরকারি পদ ও সামাজিক মর্যাদার আড়ালে মানবিক দায়িত্ববোধ কতটা বিপন্ন হয়ে পড়েছে, এই ঘটনা তা স্পষ্ট করে তুলেছে।
সচেতন মহল মনে করছেন, এই ঘটনায় দায়ী সন্তানদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এবং সমাজে এটি একটি দৃষ্টান্তমূলক নজির হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অমানবিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।