সিএমপির এসআই সৈয়দ আলমের বিরুদ্ধে ইয়াবা সিন্ডিকেট ও দুর্নীতির অভিযোগ

মো. শফিকুল ইসলাম:

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বাকলিয়া থানায় কর্মরত উপ-পরিদর্শক (এসআই নিরস্ত্র) সৈয়দ আলমের বিরুদ্ধে ইয়াবা সিন্ডিকেটের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে হয়রানি, অর্থ আদায় এবং প্রায় আড়াই কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সচেতন মহলে ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগের মুখে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা সৈয়দ আলম (বিপি নং ৭১৯১০৫২০৫১) কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম মো. জামান এবং মায়ের নাম মৃত মালেকা বেগম। তিনি ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর সিএমপির বাকলিয়া থানায় যোগদান করেন। এর আগে তিনি ডবলমুরিং থানায় কর্মরত ছিলেন। অভিযোগকারীদের দাবি, ডবলমুরিং থানায় থাকাকালীনও তাঁর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে হয়রানি, অর্থ আদায় ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল।

বিভিন্ন সূত্রের দাবি, বাকলিয়া থানায় যোগদানের পরও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কক্সবাজার অঞ্চলের ইয়াবা কারবারিদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি মাদক পরিবহনে সুবিধা প্রদান, আগাম তথ্য সরবরাহ এবং প্রশাসনিক সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো যাচাইযোগ্য নথি বা আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, সৈয়দ আলমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়টি পুলিশ বিভাগের অভ্যন্তরেও আলোচিত। তাঁদের মতে, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা পুরো বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। তাঁরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ডবলমুরিং ও বাকলিয়া থানায় কর্মরত থাকাকালে সৈয়দ আলম সাধারণ মানুষকে বিভিন্ন মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে হয়রানি করেছেন। কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও নিরীহ ব্যক্তিদের মামলার সাক্ষী হতে চাপ দেওয়া এবং রাজি না হলে মাদকসহ গুরুতর মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের কারণে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এদিকে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ গ্রহণ, মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী থানার কুঞ্জ ছায়া আবাসিক এলাকায় একটি ফ্ল্যাটসহ তাঁর নামে ও বেনামে বিভিন্ন ব্যাংকের সঞ্চয়পত্র, জমি এবং অন্যান্য সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা বলে দাবি করা হলেও সম্পদের মালিকানা ও মূল্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।

অভিযোগকারীরা মনে করছেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বৈধ আয়ের সঙ্গে কথিত বিপুল সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। এ ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে সম্পদের উৎস অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্র উল্লেখ করে অভিযোগ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর দমন-পীড়ন এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে আলোচিত সিএমপির পুলিশ সদস্যদের তালিকায় সৈয়দ আলমের নাম রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক বিভাগীয় তদন্ত বা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের মতে, একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ থানায় কর্মরত থাকায় সিএমপির বদলি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তাঁরা পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, সিএমপি কর্তৃপক্ষ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাঁদের দাবি, একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাকলিয়া থানার উপ-পরিদর্শক সৈয়দ আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *