সিলেটে হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, মৃত ১০৭; আতঙ্ক নয়, সচেতনতায় জোর

মোঃ ইসলাম উদ্দিন তালুকদার | সিলেট

সিলেট বিভাগে হামের প্রকোপ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না এলেও গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাব পরীক্ষায় নতুন করে কোনো হাম রোগী শনাক্ত হয়নি। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ ও পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৭ জনে। বুধবার (২২ জুলাই) সকালে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনো রোগী ল্যাব পরীক্ষায় শনাক্ত না হলেও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭১ জন বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২২৭ জন রোগী। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ৮৩ জন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৬ জন ভর্তি আছেন। বাকি রোগীরা জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মারা যাওয়া দুই শিশুর একজন মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার এবং অপরজন হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বাসিন্দা। মাত্র পাঁচ মাস বয়সী দুই শিশুই সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২২ জুলাই পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ল্যাব পরীক্ষায় হাম ও রুবেলায় আক্রান্ত ৫৬৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত হামের উপসর্গে ১০৩ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রাণহানির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৭ জনে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা কাশি, হাঁচি কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। টিকা না নেওয়া শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। সাধারণত উচ্চ জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, মুখের ভেতরে সাদা দাগ এবং পরে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি হামের প্রধান লক্ষণ।

চিকিৎসকদের মতে, হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই রোগীকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পুষ্টিকর খাবার, প্রচুর তরল পানীয় এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জ্বরের ওষুধ দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন-এ সেবন জটিলতা কমাতে সহায়ক হয়। শিশুকে মায়ের দুধ, নরম ভাত, খিচুড়ি, ডাল, ডিম, মাছ, দুধ, ফলমূল, ডাবের পানি ও পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তারা আরও বলেন, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি, অতিরিক্ত ঝিমুনি, বারবার বমি, খেতে না পারা, তীব্র পানিশূন্যতা বা ১০৪ ডিগ্রির বেশি জ্বর দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ সেবন করানো উচিত নয়।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা গ্রহণ। তাই শিশুদের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির আওতায় সব টিকা সময়মতো সম্পন্ন করার পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, কাশি-হাঁচির শিষ্টাচার মেনে চলা এবং পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের ভাষ্য, হাম নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই; বরং সচেতনতা, দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ এবং সময়মতো টিকাদানই পারে এই সংক্রামক রোগের বিস্তার ও মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *