স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) এক কর্মকর্তার অবিশ্বাস্য লঙ্কাকাণ্ড

​ স্টাফ রিপোর্টার : কুমিল্লা জেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী একরামুল হক। দশম গ্রেডের এই সরকারি কর্মচারীর মাসিক বেতন সর্বসাকুল্যে ৪৯ হাজার টাকা। কিন্তু এই সামান্য বেতনেই তিনি গড়ে তুলেছেন প্রায় ৫০ কোটি টাকার পাহাড়সম সম্পদ। সরকারের দুর্নীতিবিরোধী চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে এবার এই কর্মকর্তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের খোঁজে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
​কর নথিতে শুভঙ্করের ফাঁকি!
​অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একরামুল হকের আদি বাড়ি কুষ্টিয়ায় হলেও তিনি চতুরতার আশ্রয় নিয়ে নিজের আয়কর নথি জমা দিয়েছেন যশোরে। আবার তার স্ত্রী শাম্মী আক্তারের আয়কর ফাইল রেখেছেন কুষ্টিয়ায়। কর নথির এই মারপ্যাঁচ এবং বাস্তব সম্পদের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত দেখেই চোখ কপালে উঠেছে অনুসন্ধানকারীদের। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, কর নথিতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বিপুল সম্পদ গোপন করে রাখা হয়েছে।
​সম্পদের খতিয়ান: আলাদিনের চেরাগও যেখানে হার মানে
​এই দম্পতির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের যে তালিকা পাওয়া গেছে, তা সাধারণ মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়:
​১. রাজধানীর বুকেই ৩০ কোটির প্লট!
​সবচেয়ে চোখ ধাঁধানো সম্পদটি রয়েছে ঢাকার অভিজাত এলাকা বসুন্ধরা আবাসিকের ডুমনি মৌজায়। সেখানে ৯.৯০ শতাংশ জমির একটি প্লট রয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৩০ কোটি টাকা। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই একরামুলের স্ত্রী এই প্লটের নামজারির (মিউটেশন) আবেদন করেন, যার নথিপত্র এখন দুদকের হাতে।
​২. কুষ্টিয়ায় রাজকীয় ভবন ও জমির মহোৎসব
​একরামুলের মূল অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে নিজ জেলা কুষ্টিয়ায়:
​৫ কোটি টাকার বহুতল ভবন: কুষ্টিয়া সদরের মুক্তির পুকুরপাড় এলাকায় প্রায় ৫ শতাংশ জমির ওপর গড়ে তুলেছেন একটি আধুনিক ছয়তলা ভবন।
​৪ কোটি টাকার জমি: সদরের ঢাকা ঝালুপাড়া মৌজায় রয়েছে ৬৬ শতাংশ দামি জমি।
​ফ্ল্যাট ও অন্যান্য: একই এলাকায় প্রায় ৭০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট ও জমি রয়েছে তার নামে।
​৩. গৃহিণী স্ত্রীর নামে কোটি কোটি টাকার সম্পদ
​ট্যাক্স ফাইলে পেশা “ব্যবসায়ী” দেখানো হলেও স্থানীয়ভাবে জানা গেছে শাম্মী আক্তার মূলত একজন গৃহিণী। অথচ এই গৃহিণীর নামে রয়েছে:
​হাটশ হরিপুর মৌজায় ৬০ লাখ টাকার (১৮.৯৭৫ শতাংশ) জমি।
​হাজরাহাটি মৌজায় ৫০ লাখ টাকার (৪৪.১৬ শতাংশ) জমি।
​৪. বিস্তূর্ণ কৃষি সাম্রাজ্য, বাগান ও তামাক ক্ষেত
​শুধু শহর নয়, কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার গ্রামীণ জনপদেও একরামুল হক কিনেছেন বিঘার পর বিঘা জমি:
​তামাক ক্ষেত ও বাগান: হাজরাহাটি মৌজায় কয়েক দফায় প্রায় সাড়ে ৭ একর (৭৪৭ শতাংশ) জমি কিনেছেন, যার বাজারমূল্য প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকা। সেখানে চলছে তামাক চাষ ও বিশাল বাগান।
​বাজারের মালিকানা: পোড়াদহ হাজরাহাটি বাজারে তার একটি দোতলা বাড়ি ও চারটি দোকান রয়েছে। এ ছাড়া ৩০ লাখ টাকা মূল্যের একটি পানের বরজও রয়েছে তার।
​৫. ব্যাংকে অলস টাকার স্তূপ
​জমিজমার পাশাপাশি দেশের নামী-দামী ব্যাংকে একরামুল ও তার স্ত্রীর নামে রয়েছে বিপুল টাকা। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক এবং অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে প্রায় ৯১ লাখ টাকা জমা থাকার তথ্য মিলেছে।
​অভিযুক্তের অদ্ভুত সাফাই!
​দুর্নীতির এই মহাসমুদ্র নিয়ে যখন দুদক চেপে ধরেছে, তখন প্রকৌশলী একরামুল হকের দাবি বেশ হাস্যকর। তিনি দাবি করেছেন, “এই সম্পদের সিংহভাগই আসলে আমার ভাইয়ের। অনলাইন ডকুমেন্টে ভুল করে আমার নাম চলে এসেছে!” তবে ভাইয়ের সম্পদ কেন সরকারি কর্মকর্তার নিজের ও স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি বা নামজারি হলো—তার কোনো যৌক্তিক জবাব তিনি দিতে পারেননি। অন্যদিকে রাজধানীর ৩০ কোটির প্লটটি সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীনতা প্রকাশ করে বলেন, তিনি নাকি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না!
​দুদক সূত্রের কড়া বার্তা:
সরকারের “জিরো টলারেন্স” নীতি অনুযায়ী কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। একজন সামান্য বেতনের সরকারি কর্মচারীর এত বিশাল বৈভব অর্জনের পেছনের মূল উৎস এবং এর সাথে আর কোনো প্রভাবশালী চক্র জড়িত আছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দ্রুতই আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *