হরিণাকুণ্ডুর কাপাশহাটিয়া ভূমি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

কাগজে-কলমে দেশের ভূমি সেবা এখন শতভাগ ডিজিটাল। অনলাইনের মাধ্যমে আবেদন করে এবং নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধের পর ঘরে বসেই ভূমি সেবা পাওয়ার কথা সেবাপ্রার্থীদের। কিন্তু ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ৫ নম্বর কাপাশহাটিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এর ভিন্ন চিত্রের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও বিভিন্ন ভূমি সেবা নিতে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কাপাশহাটিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম ও হরিণাকুণ্ডু সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক রতন মুহরির যোগসাজশে সেখানে অনিয়মের একটি চক্র গড়ে উঠেছে। সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, ভূমি অফিসের বিভিন্ন কাজ সহজে সম্পন্ন করতে হলে রতন মুহরির মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। আর এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা ভূমি অফিসে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা নিতে গিয়ে নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই সরাসরি ভূমি অফিসে গিয়ে কাজ সম্পন্ন করার পরিবর্তে একটি নির্দিষ্ট মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখক রতন মুহরি এ ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন।

অনুসন্ধানী দলের দাবি, রতন মুহরি প্রকাশ্যেই সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন। পরে সেই অর্থ ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মহিদুল ইসলামের সঙ্গে ভাগবাটোয়ারা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি অনুসন্ধানী দলের ক্যামেরায় রতন মুহরির মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে টাকা নেওয়ার দৃশ্যও ধারণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

নামজারিতে ৪ হাজার টাকার চুক্তির অভিযোগ

সম্প্রতি ছদ্মবেশে কাপাশহাটিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অনুসন্ধান চালানো হয়। এ সময় ছদ্মবেশী প্রতিবেদকেরা নামজারি করতে সরকারি ফি কত জানতে চান। অভিযোগ অনুযায়ী, তখন সরকারি নির্ধারিত নিয়মের বাইরে গিয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম সরাসরি ৪ হাজার টাকার চুক্তির কথা বলেন।

অনুসন্ধানী দলের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪ হাজার টাকা দিলে কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই নামজারি সম্পন্ন করে দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। এ সময় টাকা নিয়ে দরদামের পুরো বিষয়টি ভিডিও ফুটেজে সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, ভূমি অফিসে নামজারির মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা নিতে এসে সরকারি নিয়ম-কানুন সম্পর্কে অনেকেই বিস্তারিত না জানায় তাঁদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। আর মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কাজ করানোর প্রবণতা থাকায় সেবাপ্রার্থীদের একটি অংশ বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সেবা নিতে রাজি হন।

১০ টাকার দাখিলায় ২০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ

শুধু নামজারির ক্ষেত্রেই নয়, জমিজমার খাজনা বা ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা কাটাতেও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে কাপাশহাটিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের বিরুদ্ধে।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ভূমি উন্নয়ন করের দাখিলা ফি ১০ টাকা হলেও এক সেবাপ্রার্থীর কাছ থেকে ২০০ টাকা দাবি করে তা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অর্থাৎ নির্ধারিত ফির তুলনায় অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে।

এক ভুক্তভোগী সেবাপ্রার্থী বলেন, “১০ টাকার দাখিলার জন্য আমাদের কাছ থেকে ২০০ টাকা নেওয়া হয়। আর ফাইল রতন মুহরির মাধ্যমে না গেলে সই হয় না। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে।”

ভুক্তভোগীর এই বক্তব্যে ভূমি অফিসের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর প্রভাব এবং সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে দাবি অনুসন্ধানী দলের।

ক্যামেরার সামনে টাকা নেওয়ার অভিযোগ

অনুসন্ধান চলাকালে রতন মুহরির মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে প্রকাশ্যে টাকা নেওয়ার দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। অনুসন্ধানী দলের দাবি, শুধু মৌখিক অভিযোগ নয়, অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তাদের কাছে ভিডিও ফুটেজসহ সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে অনুসন্ধান শেষে তাঁর মুখোমুখি হন সাংবাদিকরা। এ সময় তাঁকে নামজারি ও দাখিলার অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ এবং রতন মুহরির মাধ্যমে টাকা আদায়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়।

অনুসন্ধানী দলের দাবি, ভিডিও ফুটেজ ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তাঁর সামনে উপস্থাপন করা হলে তিনি ঘাবড়ে যান। তবে তিনি প্রশ্নগুলোর সন্তোষজনক উত্তর না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিভিন্নভাবে ‘ম্যানেজ’ করার অপচেষ্টা চালানো হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

বিভাগীয় মামলাও রয়েছে বলে জানা গেছে

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে আগে থেকেই একটি বিভাগীয় মামলা চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা চলমান থাকার পরও কীভাবে তিনি একই পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তবে বিভাগীয় মামলার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে মোবাইল ফোনে জানতে চাইলে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সৈয়দজাদী মাহবুবা মঞ্জুর মৌনা বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে হরিণাকুণ্ডু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রদীপ্ত রায় দীপন জানান, ভিডিও ফুটেজ ও প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করে অভিযুক্ত ভূমি সহকারী কর্মকর্তা এবং জড়িত দালাল চক্রের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ভূমি সেবা ডিজিটাল হওয়ার পর যেখানে নির্ধারিত সরকারি ফি পরিশোধ করে সেবাপ্রার্থীদের সহজে সেবা পাওয়ার কথা, সেখানে একটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে কাজ করানোর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এখন ভিডিও ফুটেজ ও অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসনিক তদন্তে প্রকৃত ঘটনা কীভাবে সামনে আসে, সেটিই দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *