হাঁসের খামারে লোকসান, কালো পোকার চাষে মাসে আয় দুই লাখ টাকা

জেলা প্রতিনিধি:

একসময় হাঁসের খামারে লোকসান গুনে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন পাবনার আটঘরিয়ার শিমুল হোসেন। চাকরি ছেড়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে খামার গড়লেও রোগে একের পর এক হাঁস মারা যাওয়ায় কয়েক লাখ টাকার ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি। সেই হতাশা কাটিয়ে এখন কালো পোকা চাষ করে মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় করছেন এই উদ্যোক্তা। তাঁর পাঁচটি খামারে কাজ করছেন ১৭ জন কর্মচারী।

শিমুল হোসেন পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার পারসিধাই গ্রামের মোজাহার আলী প্রামানিকের ছেলে। পাবনা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে ডিপ্লোমা শেষ করে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। প্রায় ছয় বছর আগে নিজের উদ্যোগে কিছু করার স্বপ্ন নিয়ে খামার ব্যবসা শুরু করেন তিনি।

লোকসানের পর নতুন পথের সন্ধান

শুরুতে হাঁসের খামার নিয়ে আশাবাদী ছিলেন শিমুল। পরিকল্পনা ছিল ধীরে ধীরে খামার বড় করবেন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি ঘটাবেন। কিন্তু খামারে রোগ ছড়িয়ে পড়ায় একের পর এক হাঁস মারা যায়। এতে বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন তিনি।

লোকসানের ধাক্কা সামলে নতুন করে কিছু শুরু করার পথ খুঁজছিলেন শিমুল। এ সময় ইউটিউবে কৃষি ও খামারবিষয়ক ভিডিও দেখতে গিয়ে জানতে পারেন ‘ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই’ বা কালো পোকা চাষ সম্পর্কে। এই পোকার লার্ভা প্রাণিখাদ্যে প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায়—এমন তথ্য তাঁর আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

কালো পোকার লার্ভা খাবারের উচ্ছিষ্ট ও বিভিন্ন জৈব বর্জ্য খেয়ে বেড়ে উঠতে পারে। ফলে প্রাণিখাদ্যের উপাদান উৎপাদনের পাশাপাশি জৈব বর্জ্য ব্যবহারেরও সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ঝুঁকি নিয়েই ছোট পরিসরে পোকা চাষ শুরু করেন তিনি।

পাঁচ খামারে উৎপাদন, তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান

শুরুর দিকে উৎপাদনপদ্ধতি, লার্ভার পরিচর্যা ও পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় শিমুলকে। অভিজ্ঞতা অর্জন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়াতে থাকেন। একপর্যায়ে গড়ে তোলেন পাঁচটি খামার।

বর্তমানে এসব খামারে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইয়ের লার্ভা উৎপাদন করা হচ্ছে। উৎপাদিত লার্ভা সংগ্রহ করে শুকানোর পর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হয়। চাহিদা থাকায় উৎপাদিত পণ্য দ্রুত বিক্রি হয়ে যায় বলে জানান শিমুল।

তিনি বলেন, “হাঁসের খামারে যখন লোকসান হলো, তখন অনেকটাই ভেঙে পড়েছিলাম। পরে ইউটিউব থেকে পোকা চাষের বিষয়ে জানতে পারি। প্রথমে অল্প পরিসরে শুরু করি। পরে বুঝতে পারি, এর চাহিদা আছে। এখন ধীরে ধীরে খামার বাড়িয়েছি।”

শিমুলের ভাষ্য, তুলনামূলক কম জায়গায় ও কম খরচে ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাই চাষ করা সম্ভব। তবে সফল হতে হলে সঠিক পরিচর্যা, উৎপাদনপদ্ধতি অনুসরণ এবং পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ জরুরি।

তিনি আরও বলেন, “শুরুতে মানুষ হাসাহাসি করত। পরিবারের লোকজনও পছন্দ করত না। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল পরিবার। কিন্তু আমি কাজটা চালিয়ে গেছি। এখন পাঁচটি খামার হয়েছে। মাসে প্রায় দুই লাখ টাকা আয় হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো লাগে, আমার কারণে কয়েকজন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।”

পরিবারের অবিশ্বাস থেকে স্বীকৃতি

শিমুলের এ উদ্যোগ নিয়ে শুরুতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও আপত্তি ছিল। তাঁর বাবা মোজাহার আলী প্রামানিক বলেন, প্রথমদিকে তাঁরা পোকা চাষকে ভালোভাবে নেননি। এমনকি বিরক্ত হয়ে ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এ ধরনের কাজ করে সফল হওয়া সম্ভব নয়।

তবে সময়ের সঙ্গে পরিস্থিতি বদলেছে। এখন শিমুলের খামারে অনেক শ্রমিক কাজ করেন। ছেলের উদ্যোগে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে দেখে তাঁরা আনন্দিত বলে জানান মোজাহার আলী প্রামানিক।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এলাকায় আগে এ ধরনের উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায়নি। শুরুতে বিষয়টি তাঁদের কাছে অস্বাভাবিক মনে হলেও এখন শিমুলের খামারে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় স্থানীয় কয়েকজনের আয়ের পথ খুলেছে। তাঁদের মতে, প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা পেলে এ ধরনের উদ্যোগ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।

প্রাণিখাদ্যে সম্ভাবনাময় প্রোটিনের উৎস

পাবনা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ড. মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ব্ল্যাক সোলজার ফ্লাইয়ের লার্ভা প্রাণিখাদ্যে প্রোটিনের একটি সম্ভাবনাময় উৎস। প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে চাষ করা গেলে এ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

পাবনার জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, বেকার তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাণিখাদ্যের জন্য প্রোটিনের বিকল্প উৎস তৈরিতেও এমন উদ্যোগ সম্ভাবনা তৈরি করছে।

হাঁসের খামারে লোকসানের পর নতুন উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়ানো শিমুল হোসেনের গল্প স্থানীয়ভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। তাঁর উদ্যোগে নিজের আয়ের পাশাপাশি অন্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *