মোঃ ফেরদৌস হোসেন:
সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বারুহাস ইউনিয়নের বিনোদপুর, কুসুম্বী ও চৌবাড়িয়া গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে নির্মিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী একটি উড়াল সেতু। ‘মহেশ্বর মহাশ্মশান উড়াল সেতু’ নামে পরিচিত এই সেতুটি নির্মাণে হিন্দু-মুসলিমসহ তিন গ্রামের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ও অর্থায়ন এলাকায় সম্প্রীতি ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।
স্থানীয়রা জানান, তিন গ্রামের মানুষের একমাত্র শ্মশান মহেশ্বর মহাশ্মশান। সেখানে মৃতদেহ নিয়ে যেতে দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো স্বজনদের। শ্মশানে যাওয়ার পথটি ছিল সরু আইলঘেরা। পথটির দুই পাশে ছিল ধানক্ষেত। বর্ষা মৌসুমে কাদা ও পানিতে পথটি আরও দুর্গম হয়ে পড়ত। ফলে খাটিয়ায় করে মরদেহ নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ত। অনেক সময় নৌকায় করে মরদেহ শ্মশানে নিতে হতো।
এ অবস্থায় দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে তিন গ্রামের মানুষ একত্রিত হন। নিজেদের অর্থায়নে গ্রামের আইলের ওপর সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন তারা। অন্যের জমি ব্যবহার না করে আইলের ওপর লম্বালম্বিভাবে নির্মাণ করা হয় উড়াল সেতুটি।
স্থানীয়দের উদ্যোগে শুরু হওয়া নির্মাণকাজে পরবর্তীতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় জেলা পরিষদ। প্রায় চার লাখ টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত সেতুটিতে রয়েছে ৫৬টি পিলার। এর দৈর্ঘ্য ৯৫৬ ফুট এবং প্রস্থ ৭ ফুট। ২০২৩ সালের ৯ নভেম্বর সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সেতুটির উদ্বোধন করা হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সেতু নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে বর্ষাকালে কর্দমাক্ত আইল দিয়ে মরদেহ বহন করতে গিয়ে স্বজনদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হতো। খাটিয়াও ঠিকভাবে নেওয়া যেত না। এ কারণে তিন গ্রামের মানুষ একসঙ্গে বসে সেতু নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। জায়গার সংকট থাকায় আইলের ওপর পিলার বসিয়ে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে।
তারা আরও জানান, সেতুটি নির্মাণের ফলে এখন শ্মশানে মরদেহ নেওয়া অনেক সহজ হয়েছে। তবে মহেশ্বর মহাশ্মশানের আরও কিছু উন্নয়নকাজ বাকি রয়েছে। এসব কাজ সম্পন্ন করতে সরকারি সহযোগিতা চান এলাকাবাসী।
মহেশ্বর মহাশ্মশানকে আরও উন্নত ও ব্যবহার উপযোগী করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সহযোগিতায় শ্মশানটির বাকি উন্নয়নকাজ দ্রুত সম্পন্ন হবে।
জেলা প্রশাসক মোঃ আমিনুল ইসলাম বলেন, তাড়াশের ঐতিহাসিক বারুহাস ইউনিয়নে মানুষের শ্মশানে যাতায়াত সহজ করতে জেলা পরিষদের উদ্যোগে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। ব্যতিক্রমধর্মী নির্মাণশৈলীর কারণে এটি দর্শনার্থী ও পর্যটকদেরও আকর্ষণ করছে।
তিনি আরও বলেন, সেতুটির কিছু অংশ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে বলে জানা গেছে। প্রকৌশলীদের দিয়ে সেটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, ‘মহেশ্বর মহাশ্মশান উড়াল সেতু’ শুধু শ্মশানে যাতায়াতের একটি পথ নয়; এটি তিন গ্রামের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতা, মানবিকতা ও হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতিরও একটি অনন্য নিদর্শন।