২৪ বছর ধরে গাছ লাগিয়ে চলেছেন সেলিম, গড়ছেন সবুজের ছায়াপথ

যশোর প্রতিনিধি:

‘গাছ থেকে শুধু অক্সিজেন নিয়ে আমরা বেঁচে থাকি না, গাছ আমাদের ছায়া দেয়, ফল দেয়। আবার দুর্দিনে এই গাছ বিক্রি করে আমরা টাকাও পাই। তাই গাছকে আমি স্বজনের মতোই দেখি। গাছই আমার স্বজন, গাছই আমার প্রাণ।’

গাছের প্রতি ভালোবাসা থেকেই কথাগুলো বলেন ষাটোর্ধ্ব সেলিম শাহ কোমল। এলাকায় তিনি পরিচিত ‘বৃক্ষপ্রেমী কোমল’ নামে। দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে নিজের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে রাস্তার দুই পাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আঙিনা ও বিভিন্ন স্থানে ফলদ গাছ লাগিয়ে চলেছেন তিনি। শুধু গাছ লাগানোই নয়, নিয়মিত সেগুলোর পরিচর্যাও করেন।

সেলিম শাহ কোমল যশোর সদর উপজেলার তেঘরিয়া গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজ সরকারের ছেলে। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অনার্স শেষবর্ষের পরীক্ষা দিয়েছেন। ছেলে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।

যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের নতুনহাট বাজার রেলক্রসিংয়ের পাশে তার ভুসিমালের ব্যবসা রয়েছে। তবে ব্যবসার চেয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে গাছের পরিচর্যাতেই বেশি সময় কাটে তার। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ১০ শতক বসতভিটা, ৪ বিঘা মাঠ ও নতুনহাট বাজারে ৬ শতক জমি রয়েছে তার। এর মধ্যে গ্রামের ভূমিহীনদের কবরস্থানের জন্য ৮ শতক জমি দান করেছেন তিনি।

৯০টি আমগাছ দিয়ে শুরু

২০০২ সালে নতুনহাট বাজার এলাকার সড়কের পাশে ৯০টি আমগাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে বৃক্ষরোপণ শুরু করেন সেলিম শাহ কোমল। গাছ লাগানোর পাশাপাশি সেগুলোর পরিচর্যার অনুমতি চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদনও করেন তিনি।

এবারও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেছেন। ঝিকরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কপোতাক্ষ নদ পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে ৩০০টি ফলদ গাছের চারা রোপণ ও পরিচর্যা করতে চান তিনি।

আবেদনে তিনি উল্লেখ করেছেন, তার বয়স এখন ৬০ বছর। এ বছর আনুষ্ঠানিকভাবে বৃক্ষরোপণের কাজ শেষ করতে চান। তবে রোপণ করা গাছগুলো পরবর্তী পাঁচ থেকে ছয় বছর পর্যন্ত নিজেই পরিচর্যা করবেন।

প্রতি বছর নিজের অর্থে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সড়কের পাশে ফলদ গাছ লাগান কোমল।

নতুনহাট বাজার, বাজে দুর্গাপুর বাজার, বাজে দুর্গাপুর মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ, এড়েন্দা বাজার ও সড়ক, নারাঙ্গালি বাজার ও সড়ক, হালসা বাজার ও সড়ক, নতুনহাট-ডুমদিয়া সড়ক, তেঘরিয়া-ধোপাখোলা সড়কসহ বিভিন্ন এলাকায় তার লাগানো গাছ রয়েছে। এছাড়া ঝিকরগাছা উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও সড়ক, যশোর-বেনাপোল মহাসড়কের নতুনহাট-লাউজানি এবং গাজীর দরগাহ ইয়াতিম কমপ্লেক্সেও গাছ লাগিয়েছেন তিনি।

তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে আম, কাঁঠাল, বেল ও বিদেশি গাব। নতুনহাট বাজার থেকে গাজীর দরগাহ ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে শতাধিক বেলগাছও লাগিয়েছেন তিনি।

গাছ লাগিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়

সেলিম শাহ কোমলের বিশেষত্ব শুধু গাছ লাগানোতে নয়; গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতেও তার নিরলস চেষ্টা। কোনো গাছ নষ্ট হয়ে গেলে একই জায়গায় একাধিকবার চারা লাগিয়েছেন। কোথাও কোথাও ছয়-সাতবার পর্যন্ত গাছ লাগাতে হয়েছে তাকে।

গাছ রক্ষায় বাঁশের খাঁচা ও বেড়া দেওয়া, গোবর লেপনসহ নানা ব্যবস্থা নেন তিনি। গাছ যেন গবাদিপশু বা অন্য কোনো কারণে নষ্ট না হয়, সেদিকেও রাখেন বিশেষ নজর।

এই কাজ করতে গিয়ে অনেক সময় পরিবার-পরিজন ও এলাকাবাসীর তিরস্কারও শুনতে হয়েছে তাকে। তবু দমে যাননি। তার দোকানের পাশে থাকা আম ও কাঁঠালগাছও যেন তার বৃক্ষপ্রেমের প্রতীক। এমনকি দোকানের সাইনবোর্ডটিও কাঠের ওপর খোদাই করে লেখা।

সেলিম শাহ কোমল বলেন, চৈত্র মাসে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও ফলদ গাছে পাতা থাকে। এসব গাছ পরিবেশের তাপমাত্রা কমাতে এবং জীবজগতকে স্বস্তি দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই তিনি ফলদ বৃক্ষ লাগানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেন।

তিনি বলেন, ‘আমি যে আমগাছগুলো লাগাই, সেগুলো কলমের নয়, আঁটির গাছ। এসব গাছ অনেক বড় হয়, পাতাও বেশি সবুজ থাকে।’

গাছ রক্ষায় ছুটে যান খবর পেলেই

বৃক্ষ রক্ষার প্রতি তার ভালোবাসার একটি ঘটনার কথাও জানান কোমল। একদিন নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার সময় খবর পান, একটি গাছ গরু নষ্ট করছে। খবর পেয়েই নামাজের পথ বদলে গাছটি রক্ষায় ছুটে যান তিনি। এ ঘটনায় এলাকার অনেকেই তাকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু এসব সমালোচনাও তাকে থামাতে পারেনি।

তার স্বপ্ন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ চালিয়ে যাওয়া। তিনি চান, সড়কের দুই পাশে একদিন গড়ে উঠুক ছায়াঘেরা সবুজ পথ।

স্থানীয় রাব্বি হোসেন বলেন, তিনি প্রায় ৮-৯ বছর ধরে সেলিম শাহ কোমলকে চেনেন। বাজে দুর্গাপুর মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে যখন কোমল আমগাছ লাগিয়েছিলেন, তখন থেকেই তার বৃক্ষপ্রেমের বিষয়টি জানেন তিনি।

কোমলের ছেলে শিহাব শাহ সুমন বলেন, গত দুই বছর ধরে তিনিও গাছ লাগানোর কাজ করছেন। বাবার দেখানো পথ অনুসরণ করে ভবিষ্যতেও এই কাজ চালিয়ে যেতে চান।

ঝিকরগাছা সরকারি বহুমুখী (এমএল) মডেল হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তাফিজুর রহমান আজাদ বলেন, সেলিম শাহ কোমল যে কাজ করছেন, তা নিঃসন্দেহে একটি মহৎ উদ্যোগ। এমন কাজে সমাজের সবার এগিয়ে এসে তাকে সহযোগিতা করা উচিত।

নিজের জীবনের সঞ্চয়, শ্রম আর ভালোবাসা দিয়ে সেলিম শাহ কোমল হয়তো একাই বদলে দিতে পারবেন না পুরো এলাকার পরিবেশ। তবে তার লাগানো প্রতিটি গাছ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছে সবুজ, ছায়া ও ফলের এক অনন্য উত্তরাধিকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *