আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
১৯৯৭ সালের মে মাসে পাকিস্তানের আকাশসীমায় ভারতের একটি মিগ-২৫ গোয়েন্দা বিমান প্রবেশ করেছিল—এতদিনের রহস্যময় সেই ঘটনার বিস্তারিত এবার সামনে এসেছে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমানটি প্রায় ৬৫ হাজার ৬১৭ ফুট উচ্চতায় ঘণ্টায় প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার গতিতে পাকিস্তানের আকাশসীমা অতিক্রম করেছিল।
১৯৯৭ সালের ২৭ মে ওই ঘটনা ঘটে। ভারতীয় বিমানবাহিনীর তৎকালীন ট্রাইসনিকস স্কোয়াড্রনের সদস্য অবসরপ্রাপ্ত উইং কমান্ডার প্রদীপ জস্বন্ত ঠাকুর বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। এনডিটিভির ‘CtrlAltDefence’ পডকাস্টে তিনি জানান, মিগ-২৫ বিমানটি প্রায় ২০ কিলোমিটার উচ্চতায় ২ দশমিক ৪ ম্যাক গতিতে উড়েছিল।
ঘটনার দিন পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বিকট শব্দ শোনা যায়। শব্দের কারণ হিসেবে তখন ভারতীয় মিগ-২৫কে দায়ী করেছিল পাকিস্তান। পরে ভারত দাবি করে, কোনো ভারতীয় সামরিক বিমান আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করেনি।
তবে অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন সত্যিই একটি মিগ-২৫ পাকিস্তানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছিল। বিমানটি শনাক্ত করেছিল পাকিস্তান বিমানবাহিনীও। তাদের ধারণা ছিল, প্রায় ৬০ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ে যাওয়া বিমানটি ভারতের মিগ-২৫।
বিভিন্ন বর্ণনায় বলা হয়, বিমানটি শনাক্ত হওয়ার পর পাকিস্তানের এফ-১৬ যুদ্ধবিমানও আকাশে ওঠে। তবে এর আগেই মিগ-২৫ দ্রুতগতিতে পাকিস্তানের আকাশসীমা ছেড়ে অনেক দূরে চলে যায়।
মিগ-২৫ ছিল মূলত উচ্চগতির গোয়েন্দা ও ছবি তোলার কাজে ব্যবহৃত বিমান। এর নাকে পাঁচটি ক্যামেরা সংযুক্ত ছিল। চারটি ক্যামেরা পাশের বিস্তীর্ণ এলাকার ছবি তুলত এবং একটি ক্যামেরা সরাসরি নিচের দিকে তাক করে নির্দিষ্ট স্থানের স্থানাঙ্ক ধারণ করতে পারত। সামরিক পরিকল্পনা ও সম্ভাব্য অভিযানের ক্ষেত্রে এসব ছবি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১৯৯৭ সালের ওই উড্ডয়নের সময় বিমানটির উচ্চগতি থেকেই তৈরি হয় ‘সনিক বুম’। শব্দের চেয়ে বেশি গতিতে কোনো বিমান উড়লে সৃষ্ট শকওয়েভের কারণে এ ধরনের বিকট শব্দ তৈরি হয়। পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় সেদিন যে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা গিয়েছিল, সেটিই সনিক বুম বলে ব্যাখ্যা করা হয়।
মিগ-২৫-এর অভিযানগুলো ছিল অত্যন্ত গোপনীয়। স্কোয়াড্রনের সব সদস্যও আগে থেকে জানতে পারতেন না কখন বা কোথায় কোনো অভিযান পরিচালিত হবে। ফোনে সাধারণত এসব নির্দেশ দেওয়া হতো না। কমান্ডিং অফিসারকে সদর দপ্তরে ডেকে লক্ষ্যবস্তুর তথ্য জানানো হতো এবং পরে নির্দিষ্ট পাইলটকে দায়িত্ব দেওয়া হতো।
১৯৯৯ সালের কারগিল যুদ্ধের সময়ও মিগ-২৫ ব্যবহার করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সে সময় তুলনামূলক নিচু উচ্চতায় বিমান উড়িয়ে পাকিস্তানি অবস্থানের ছবি তোলা হয়। এসব ছবি ভারতীয় স্ট্রাইক পাইলটদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে সহায়তা করেছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে স্যাটেলাইট প্রযুক্তির উন্নতির কারণে মিগ-২৫-এর প্রয়োজনীয়তা কমে যায়। প্রায় ২৫ বছর সেবায় থাকার পর ২০০৬ সালের ১ মে ভারতীয় বিমানবাহিনী তাদের মিগ-২৫ বহর অবসর নেয়।
দীর্ঘ ২৯ বছর পর অবসরপ্রাপ্ত ভারতীয় কর্মকর্তার বক্তব্যে ১৯৯৭ সালের সেই আলোচিত ঘটনার নতুন তথ্য সামনে এলো। তবে পাকিস্তানের আকাশসীমায় ভারতীয় মিগ-২৫ প্রবেশের বিষয়টি পাকিস্তান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।