৪৩ বছরেও সংকট কাটেনি গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে, জনবল-সরঞ্জামের অভাবে ভোগান্তি

জেলা প্রতিনিধি:

গাইবান্ধার প্রায় ২৭ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান ভরসা গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতাল। বিশেষ করে অর্থনৈতিক কারণে বেসরকারি ক্লিনিক কিংবা দেশের নামিদামি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য যাদের নেই, তাদের জন্য হাসপাতালটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছর পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটি এখনো পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি।

ছয় বছর আগে হাসপাতালটি ২৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও এখনো ১০০ শয্যার জনবল দিয়েই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এর মধ্যে প্রায় চার বছর আগে ৯ তলা আধুনিক ভবনের নির্মাণকাজ শেষ করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া হলেও জনবল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে ভবনটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। ফলে চিকিৎসা নিতে এসে প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন জেলার লাখ লাখ মানুষ।

১৯৮৪ সালে মাত্র ৫০ শয্যা নিয়ে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ২০১৬ সালের ৬ অক্টোবর এটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০১৮ সালের ৮ মে ২০০ শয্যা এবং সর্বশেষ ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।

তবে শয্যা বাড়লেও বাস্তবে হাসপাতালের জনবল ও যন্ত্রপাতি এখনো ১০০ শয্যার কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গত ২৮ জুলাইয়ের হাসপাতালের হালনাগাদ জনবল তথ্য অনুযায়ী, ১০০ শয্যার হিসাবেই চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট পদে ২০৮ জন থাকার কথা থাকলেও কর্মরত রয়েছেন ১৩০ জন। ফলে শূন্য রয়েছে ৭৮টি পদ।

বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে সিনিয়র কনসালটেন্ট মেডিসিন, চক্ষু, কার্ডিওলজি, অ্যানেস্থেসিয়া, চর্ম ও যৌন রোগ, ইএনটি, অর্থো সার্জারি এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট অর্থোপেডিকসসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসকের পদ। জেনারেল পদগুলোতেও রয়েছে জনবল সংকট।

গত রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) হাসপাতালটিতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পুরোনো ভবনের আন্তঃবিভাগের ওয়ার্ডগুলোতে শয্যা সংকটের কারণে নিচতলা ও দোতলার বারান্দা, করিডোর এবং সিঁড়ির পাশে মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। এতে স্বাভাবিক চলাচলেরও সুযোগ নেই।

একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন থাকায় হাসপাতালের ভেতরে রোগী ও স্বজনদের ভিড়ও দেখা যায়। অন্যদিকে হাসপাতালের মূল গেট পর্যন্ত রিকশা, অটোরিকশা ও ভ্যানের ভিড়ে স্বাভাবিক চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। হাসপাতালের মাঠে গ্যারেজের নামে আগে একটি দোকান থাকলেও বর্তমানে সেখানে দুটি দোকান গড়ে উঠেছে। এসব দোকানের আশপাশে প্রকাশ্যে ধূমপান করতেও দেখা যায়।

প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ শয্যার ৯ তলা আধুনিক হাসপাতাল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২২ সালের এপ্রিলের শুরুতে গণপূর্ত বিভাগ ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু ভবন বুঝে পাওয়ার চার বছর পরও প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে এটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি।

নতুন ভবনটি পুরোপুরি চালু করতে বিদ্যমান জনবলের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট পদে আরও ২৭১ জন জনবল প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরেজমিনে নতুন ভবনে দেখা যায়, সেখানে কেবল টিকিট কাউন্টার, বহির্বিভাগের চিকিৎসা, ফার্মেসিসহ দু-একটি সেবা চালু রয়েছে। ভবনের সিংহভাগ অংশই অব্যবহৃত পড়ে আছে।

হাসপাতালের আন্তঃবিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে আন্তঃবিভাগে মোট ৩৬ হাজার ১৬৭ রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে গাইনি, শিশু, স্ক্যানু, মহিলা, পুরুষ ও ডায়রিয়াসহ কয়েকটি বিভাগ থেকে ২ হাজার ৬৪৪ জন রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়েছে। একই সময়ে মৃত্যু হয়েছে ৩২৫ জনের।

তবে এই হিসাব শুধু আন্তঃবিভাগের। এর বাইরে জরুরি বিভাগ থেকেও প্রতিদিন গুরুতর ও আশঙ্কাজনক রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রেফার্ড করা হয়।

জরুরি বিভাগ সূত্র জানায়, জনবল সংকটের কারণে প্রায় প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন রোগীকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করা হচ্ছে। তবে কোন রোগে কতজন রোগী প্রতিদিন রেফার্ড করা হচ্ছে, তার সুনির্দিষ্ট কোনো রেকর্ড জরুরি বিভাগে পাওয়া যায়নি।

হাসপাতালের নার্সিং সুপারভাইজার বীনাপানি গোলদার বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে এখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রায় সব ধরনের রোগীকে রেফার্ড করা হয়। বিশেষ করে মেডিসিন, কার্ডিয়াক, শিশু, ডায়রিয়া ও গাইনি বিভাগের রোগীদের বদলি করা হয়।

হাসপাতালের স্টোর কিপার বিষ্ণুপদ রায় জানান, হাসপাতালে থাকা পাঁচটি অটোক্লেভ মেশিনের মধ্যে একটি চালু রয়েছে। অ্যানেস্থেসিয়ার পাঁচটি মেশিনই অচল। অটো টেবিল মেশিনের তিনটি এবং অটো লাইট মেশিনের চারটির মধ্যে একটি অচল।

তিনি আরও জানান, চারটি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে ১০০০ এমএ ও ৫০০ এমএ-এর দুটি এক্স-রে মেশিন এবং একটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন চালু রয়েছে।

সিনিয়র স্টাফ নার্স স্বপ্না রানী বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৭১ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪০১ জন। জনবলের তুলনায় রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় তারা হিমশিম খাচ্ছেন। চেষ্টা করেও সবসময় চিকিৎসার পরিবেশ ঠিক রাখা সম্ভব হয় না।

আন্তঃবিভাগে সিট না পেয়ে করিডোরে চিকিৎসা নেওয়া কিশোর তৌসিফের মা স্নিগ্ধা রহমান বলেন, ছেলের শ্বাসকষ্ট নিয়ে তারা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চিকিৎসক দেখেছেন এবং নার্সরা প্রয়োজনীয় ওষুধ দিচ্ছেন। তবে রোগীর চাপ বেশি থাকায় কোনো সিট পাননি, তাই মেঝেতে জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।

রোগীর স্বজন জাহিদুল বলেন, একজন রোগীর সঙ্গে দুই থেকে তিনজন স্বজন থাকেন। ফলে অনেক সময় চেঁচামেচি হয় এবং হাসপাতালের পরিবেশও নষ্ট হয়। বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেখা দরকার।

নতুন ভবনের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা সুমনা আক্তার বলেন, আগের তুলনায় আউটডোরের পরিবেশে পরিবর্তন এসেছে। বড় পরিসরে খোলামেলাভাবে সেবা পাওয়া যাচ্ছে। তবে একজন চিকিৎসককে অনেক রোগী দেখতে হয় এবং সব ধরনের ওষুধও পাওয়া যায় না। ফলে বেশিরভাগ সময়ই বাইরে থেকে দামি ওষুধ কিনতে হয়।

হাসপাতালের চিকিৎসক শেখ সুলতান আহমেদ সোহেল বলেন, প্রতিনিয়ত রোগীর চাপ বাড়ছে। বহির্বিভাগে অনেক সময় একজন চিকিৎসককে দেড় থেকে ২০০, কখনো তারও বেশি রোগী দেখতে হয়। চিকিৎসকের যথেষ্ট সংকট রয়েছে। জনবল নিয়োগ করা হলে সেবার মান আরও উন্নত করা সম্ভব।

গাইবান্ধার পরিবেশ আন্দোলনের আহ্বায়ক গোলাম রব্বানী মুসা বলেন, গাইবান্ধার একমাত্র জেলা হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা ভঙ্গুর। তিনি এ পরিস্থিতির জন্য স্থানীয় রাজনীতিকদের দায়ী করেন এবং স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। গাইবান্ধার মানুষের সুচিকিৎসার জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, চার বছর ধরে আধুনিক ভবন পড়ে থাকা সরকারের চরম অবহেলার বিষয়।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) আসিফ রহমান বলেন, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল হলেও জনবল রয়েছে ১০০ শয্যার হিসাব অনুযায়ী। চিকিৎসকের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। তবে তারা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেবার মান উন্নত হওয়ায় হাসপাতালে সব ধরনের রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে জরুরি প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও আলাদা আলাদা বিভাগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শহীদুল্লাহ বলেন, বহুতল ভবনটি বুঝে নেওয়া হলেও জনবল ও সরঞ্জামের অভাবে পুরোপুরি চালু করা যায়নি। আধুনিক ভবনটি চালু হলে হাসপাতালের অনেক সংকটের সমাধান হবে বলে আশা করছেন তারা। বিষয়গুলো নিয়মিত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে লিখিতভাবে জানানো হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *