স্টাফ রিপোর্টার: দেশের হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট, হার্ট ভাল্ব, পেসমেকারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মেডিকেল ডিভাইস আমদানি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দ্য স্পন্দন লিমিটেডের মালিকানা, ব্যবসা পরিচালনা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কাজী মকবুল হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী শারমিন হোসেন ও ছেলে কাজী আকরাম হোসেন উত্তরাধিকার সূত্রে কোম্পানির প্রায় ৪৫ শতাংশ শেয়ারের মালিক ও পরিচালক হলেও গত আট বছর ধরে তাঁরা কোনো লভ্যাংশ পাননি বলে অভিযোগ করেছেন।
তাঁদের অভিযোগ, ২০১৮ সালে কাজী মকবুল হোসেনের মৃত্যুর পর থেকেই কোম্পানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে তাঁদের কার্যত দূরে রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে কোম্পানির আর্থিক হিসাব, ব্যাংক লেনদেন, অডিট রিপোর্ট ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্পর্কে তাঁদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি। এমনকি নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) এবং বাধ্যতামূলক স্ট্যাচুটরি অডিটও করা হয়নি বলে মামলার আবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, দ্য স্পন্দন লিমিটেডের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম, বিশেষ করে হার্ট ভাল্ব, করোনারি স্টেন্ট, পেসমেকারসহ বিভিন্ন কার্ডিয়াক মেডিকেল ডিভাইসের বিপণন ও সরবরাহের ব্যবসা স্পেসমেড এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে স্থানান্তর করা হয়েছে। এতে স্পন্দন লিমিটেডের ব্যবসায়িক স্বার্থ, সম্পদ, ব্র্যান্ড মূল্য এবং শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাদীপক্ষ।
এদিকে মামলার প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট কোম্পানির তহবিল অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ওপর তিন মাসের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে নোটিশ জারি এবং আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী অ্যাফিডেভিট অব কমপ্লায়েন্স দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নথি, মামলার আবেদন এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর শুরু বিরোধ
১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য স্পন্দন লিমিটেড দীর্ঘদিন ধরে দেশের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও বিশেষায়িত হৃদরোগ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের কার্ডিয়াক মেডিকেল ডিভাইস সরবরাহ করে আসছে। স্টেন্ট, হার্ট ভাল্ব, পেসমেকারসহ হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিকিৎসক ও রোগীর স্বজনদের কাছেও প্রতিষ্ঠানটির পরিচিতি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক কাজী মকবুল হোসেন ২০১৮ সালে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী শারমিন হোসেন ও ছেলে কাজী আকরাম হোসেন উত্তরাধিকার সূত্রে কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার ও পরিচালক হন।
বর্তমান মালিকানা কাঠামো অনুযায়ী, কাজী মকবুল হোসেনের উত্তরাধিকারীদের হাতে প্রায় ৪৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। অপরদিকে আরেক প্রতিষ্ঠাতা বিনিয়োগকারী আনিসুর রহমান ও তাঁর ছেলে সাদ রহমানের হাতে প্রায় ৫৫ শতাংশ শেয়ার রয়েছে বলে মামলার সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পর থেকেই তাঁদের সঙ্গে কোম্পানি পরিচালনার ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয়। কোম্পানির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, আর্থিক হিসাব এবং ব্যবসার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁদের অবহিত করা হয়নি।
আট বছর ধরে লভ্যাংশ না পাওয়ার অভিযোগ
শারমিন হোসেন ও কাজী আকরাম হোসেনের দাবি, ২০১৮ সালের পর থেকে তাঁদের নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি। শুরুতে কোম্পানি থেকে কিছু সম্মানী দেওয়া হলেও ২০২৫ সালে সেটিও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তাঁদের অভিযোগ, কোম্পানির লাভ-ক্ষতির হিসাব, ব্যাংক হিসাব ও অন্যান্য আর্থিক তথ্য তাঁদের কাছে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে তাঁদের মালিকানাধীন শেয়ারের বিপরীতে কোম্পানির প্রকৃত আয় ও লভ্যাংশের পরিমাণ সম্পর্কেও তাঁরা নিশ্চিত হতে পারছেন না।
হাইকোর্টে মামলা
অভিযোগগুলোর প্রতিকার চেয়ে শারমিন হোসেন ও কাজী আকরাম হোসেন গত ১০ মে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের কোম্পানি কোর্টে কোম্পানি ম্যাটার নং-৪৬৪/২০২৬ মামলা করেন।
বাদীপক্ষের হয়ে মামলাটি পরিচালনা করছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মীর এ কে এম নুরুন্নবী।
মামলার আবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির বাধ্যতামূলক স্ট্যাচুটরি অডিট সম্পন্ন হয়নি। পরিচালকদের কাছে কোম্পানির আর্থিক বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, লেনদেনের তথ্য এবং লভ্যাংশ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ করা হয়নি।
এ ছাড়া পরিচালকদের সম্মতি ছাড়া নতুন পরিচালক নিয়োগ এবং কোম্পানির অর্থ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তরের অভিযোগও আনা হয়েছে।
শেয়ারহোল্ডারদের সম্মতি ছাড়াই ব্যবসা স্থানান্তরের অভিযোগ
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলোর একটি হলো, দ্য স্পন্দন লিমিটেডের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের অধীনে নেওয়া হয়েছে।
বাদীপক্ষের দাবি, হার্ট ভাল্ব, করোনারি স্টেন্ট, পেসমেকারসহ বিভিন্ন কার্ডিয়াক মেডিকেল ডিভাইসের আমদানি, বিপণন ও সরবরাহের যে ব্যবসা দীর্ঘদিন ধরে স্পন্দন লিমিটেডের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে আসছিল, তা পরিচালকদের প্রয়োজনীয় সম্মতি ছাড়াই স্পেসমেড এন্টারপ্রাইজ লিমিটেডের অধীনে স্থানান্তর করা হয়েছে।
তাঁদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে স্পন্দন লিমিটেডের ব্যবসায়িক সুযোগ ও সম্পদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের ব্র্যান্ড মূল্যও অন্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে চলে গেছে। এতে কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থাও শেয়ারহোল্ডারদের কাছে অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ
মামলা করার পর থেকে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন শারমিন হোসেন।
তিনি অভিযোগ করেন, কোম্পানির আর্থিক হিসাব ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেখতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমানের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। তাঁর দাবি, গভীর রাতেও তাঁর বাসায় লোক পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বলেও জানান।
তবে শারমিন হোসেনের এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাহফুজুর রহমান।
শারমিন হোসেন বলেন, কোম্পানির আর্থিক কর্মকাণ্ড ও ব্যবসা পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশ
বাদীপক্ষের আইনজীবী মীর এ কে এম নুরুন্নবী বলেন, প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট মামলাটি গ্রহণ করেছেন এবং প্রতিপক্ষের প্রতি নোটিশ জারি করেছেন।
তিনি জানান, আদালত দ্য স্পন্দন লিমিটেডের তহবিল অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থায় স্থানান্তরের ওপর তিন মাসের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অ্যাফিডেভিট অব কমপ্লায়েন্স দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাদীপক্ষের আইনজীবীর ভাষ্য, কোম্পানির সম্পদ ও ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের অধিকার নিশ্চিত করতেই আদালতের এই অন্তর্বর্তী আদেশ গুরুত্বপূর্ণ।
যা বলছেন প্রতিপক্ষ
অভিযোগের বিষয়ে দ্য স্পন্দন লিমিটেডের অপর প্রতিষ্ঠাতা বিনিয়োগকারী আনিসুর রহমান বলেন, স্পেসমেড এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড মূলত তাঁরই প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। ব্যবসার শুরুতে অর্থসংকট থাকায় তিনি কাজী মকবুল হোসেনের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছিলেন। ব্যবসা পরিচালনার সময় অভিজ্ঞতার কারণে তাঁর হাতে ৫৫ শতাংশ এবং কাজী মকবুল হোসেনের হাতে ৪৫ শতাংশ শেয়ার ছিল বলে দাবি করেন তিনি।
আনিসুর রহমানের দাবি, ২০১৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর কাজী মকবুল হোসেন নিজেই তাঁর ছেলে সাদ রহমানকে ব্যবসার একটি অংশে যুক্ত করার কথা বলেছিলেন। তবে এ দাবির পক্ষে তিনি কোনো নথি দেখাতে পারেননি।
কাজী মকবুল হোসেনের উত্তরাধিকারীদের লভ্যাংশ না দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে আনিসুর রহমান বলেন, তাঁরাও কোম্পানি থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ নেন না। তাঁরা শুধু কিছু সম্মানী নিতেন, যা ২০২৫ সালের পর বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি দাবি করেন, বর্তমানে কোম্পানির ব্যবসা লোকসানে রয়েছে এবং বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানের শতকোটি টাকার বেশি ব্যবসা থাকার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন।
তবে ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি, কোম্পানির ব্যবসা অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর এবং কোম্পানির অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাননি।
অপরদিকে সাদ রহমান বলেন, বিষয়টি যেহেতু আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে, তাই আদালতের মাধ্যমে এর সমাধান হওয়াই এখন জরুরি।
বিরোধের সমাধান নিয়ে অপেক্ষা
দ্য স্পন্দন লিমিটেডের মালিকানা ও ব্যবসা পরিচালনা নিয়ে দুই পক্ষের এই বিরোধ এখন আদালতের বিচারাধীন। একদিকে প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারীরা তাঁদের শেয়ার অনুযায়ী অধিকার, লভ্যাংশ ও কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা দাবি করছেন। অন্যদিকে অপর পক্ষ কোম্পানির বর্তমান ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ও পরিচালনা নিয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে।
হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশের পর কোম্পানির তহবিল ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে পরবর্তী সময়ে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই এখন সংশ্লিষ্টদের নজর। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির মধ্য দিয়েই কোম্পানির মালিকানা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা স্থানান্তর নিয়ে ওঠা অভিযোগের আইনি সমাধান হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।