স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠলেও সম্প্রতি এসব অভিযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে অফিসটির নকলনবিশ মো. গিয়াস উদ্দিনের নাম। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এবং সেবা গ্রহণে আসা ব্যক্তিদের অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বহিরাগতদের নিয়ে অফিসে প্রভাব বিস্তার করে কার্যত একটি অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। তার ক্ষমতার দাপটের কারণে অনেকেই তাকে ‘বিকল্প সাব-রেজিস্ট্রার’ বলেও অভিহিত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দলিল তল্লাশি, নকল উত্তোলন, রেকর্ড সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে সরকার নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে নানা অজুহাতে হয়রানি করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে অতিরিক্ত অর্থ দিতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গিয়াস উদ্দিন তার অবস্থান ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে রেকর্ডরুমে অননুমোদিত ব্যক্তিদের প্রবেশের সুযোগ করে দেন। নকল ও সার্চিং ফি বাবদ আদায়কৃত অর্থের সঙ্গে ট্রেজারি চালানের যথাযথ মিল না রেখে ইচ্ছামতো অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া কিছু ক্ষেত্রে জাল কাগজপত্র ও অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে দলিল প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার অভিযোগও উঠে এসেছে।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অফিসটিতে বিভিন্ন ধাপে সরকার নির্ধারিত ফি ছাড়াও অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। দলিল নিবন্ধন, কাগজপত্র যাচাই, রেকর্ড অনুসন্ধান কিংবা প্রশাসনিক সহায়তার ক্ষেত্রেও একটি অলিখিত অর্থ লেনদেনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে তারা অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, এসব কর্মকাণ্ডে নকলনবিশ গিয়াস উদ্দিনের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও শক্তিশালী যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে গিয়াস উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরেই অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে প্রভাবশালী অবস্থান ধরে রেখেছেন। স্থানীয়ভাবে তিনি যুবলীগের পদধারী নেতা ছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তার অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং আগের মতোই দাপটের সঙ্গে কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো জমির শ্রেণি পরিবর্তনের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৩ মে ২০২৬ তারিখে সম্পাদিত ৩৪৫৯ নম্বর একটি সাব-কবলা দলিলে প্রায় ১০ দশমিক ৬৬ কাঠা অত্যন্ত মূল্যবান বসতভিটার জমিকে ‘নাল জমি’ হিসেবে দেখানো হয়। এর ফলে প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় অনেক কম রাজস্ব আদায় হয়েছে এবং সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই অনিয়মের পেছনে নকলনবিশ গিয়াস উদ্দিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
আরও অভিযোগ রয়েছে, গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি দলিল নিবন্ধিত হলেও এসব দলিলের আর্থিক মূল্য অত্যন্ত বেশি হওয়ায় প্রতিটি লেনদেনেই বড় অঙ্কের অর্থ জড়িত থাকে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্রের মাধ্যমে জাল কাগজপত্র, অসত্য তথ্য কিংবা মালিকানার ইতিহাস যথাযথভাবে যাচাই না করেই কিছু দলিল নিবন্ধনের সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে প্রকৃত মালিকরা সম্পত্তি নিয়ে জটিলতায় পড়ছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি আইনি বিরোধেরও সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে গিয়াস উদ্দিন বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং প্রভাব খাটিয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার মাধ্যমে তিনি অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য ও সম্পদের বিবরণ পৃথক অনুসন্ধানে প্রকাশ করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য নকলনবিশ মো. গিয়াস উদ্দিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।