হাজারীবাগে পারিবারিক বিরোধে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে থানায় নেওয়ার অভিযোগ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

এম ইসমাত:

রাজধানীর হাজারীবাগ থানাধীন ধানমন্ডির মধুবাজার বড় মসজিদ রোডে নির্মাণাধীন একটি নয়তলা ভবনকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধের জেরে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ভবনটির মালিকানা ও নির্মাণকাজ নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের ধারাবাহিকতায় নির্মাণকাজে নিয়োজিত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে হাজারীবাগ থানা পুলিশের বিরুদ্ধে। পরবর্তী সময়ে তাঁদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পক্ষের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে। পাশাপাশি পারিবারিক ও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধে পুলিশের হস্তক্ষেপের আইনগত এখতিয়ার এবং এর পেছনের কারণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মধুবাজার বড় মসজিদ রোডে অবস্থিত নির্মাণাধীন নয়তলা ভবনটির মালিকানা, নির্মাণকাজ পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ চলে আসছে। একপর্যায়ে এ বিরোধ আরও জটিল আকার ধারণ করে। এরই মধ্যে সম্প্রতি হাজারীবাগ থানা পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ভবনটির নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে থানায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। পরে তাঁদের কাছ থেকে মুচলেকা গ্রহণ করে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে কী কারণে তাঁদের থানায় নেওয়া হয়েছিল, তাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছিল কি না এবং কোন আইনি বিধানের আওতায় মুচলেকা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি মূলত দেওয়ানি প্রকৃতির। এ ধরনের বিরোধের নিষ্পত্তি আদালত কিংবা সংশ্লিষ্ট আইনগত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হওয়ার কথা। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নির্মাণকাজে নিয়োজিত পেশাদার ব্যক্তিদের থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা তাঁদের কাছে অপ্রত্যাশিত ও উদ্বেগজনক। তাঁদের দাবি, প্রকৌশলী ও ঠিকাদার ভবনটির নির্মাণকাজের সঙ্গে পেশাগতভাবে যুক্ত ছিলেন। মালিকানা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধ থাকলেও সেই বিরোধের দায় তাঁদের ওপর বর্তানোর সুযোগ নেই। কোনো পক্ষের সঙ্গে বিরোধের কারণে তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা কিংবা থানায় নিয়ে যাওয়ার আগে যথাযথ আইনগত ভিত্তি থাকা জরুরি।

এদিকে ভুক্তভোগী পক্ষ আরও দাবি করেছে, পুলিশের কাছে জানতে চাওয়া হলেও নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) কিংবা অন্য কোনো সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানের জারি করা লিখিত আদেশ বা নির্দেশনাপত্র তাঁদের দেখানো হয়নি। রাজউকের কোনো স্থগিতাদেশ, আদালতের নিষেধাজ্ঞা কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লিখিত নির্দেশনা ছাড়া কীভাবে নির্মাণকাজে হস্তক্ষেপ করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তাঁদের বক্তব্য, কোনো সরকারি কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা থাকলে সেটি সংশ্লিষ্টদের সামনে উপস্থাপন করা উচিত ছিল। অন্যথায় শুধু পারিবারিক বিরোধের কারণে নির্মাণকাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের থানায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রশাসনিক ক্ষমতার যথাযথ প্রয়োগ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পারিবারিক সম্পত্তি, জমির মালিকানা কিংবা ভবন নির্মাণ নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা নিষ্পত্তির জন্য প্রচলিত আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া রয়েছে। কোনো পক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে পারে এবং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে সেই পদক্ষেপের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, আইনগত ভিত্তি ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কোনো ব্যক্তিকে থানায় নেওয়া বা তাঁর কাছ থেকে মুচলেকা গ্রহণের ক্ষেত্রে কী আইনগত কারণ ছিল, তা স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

ভুক্তভোগী পক্ষের অভিযোগ, পুলিশের এ ধরনের হস্তক্ষেপ বিরোধ নিষ্পত্তির পরিবর্তে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। তাঁদের আশঙ্কা, পারিবারিক বিরোধের সুযোগ নিয়ে কোনো পক্ষ যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চায়, তাহলে সাধারণ নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে নির্মাণকাজে নিয়োজিত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের মতো পেশাজীবীদের এ ধরনের বিরোধের মধ্যে জড়িয়ে পড়তে হলে ভবিষ্যতে কোনো প্রকল্পে কাজ করার ক্ষেত্রেও তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে থানায় নেওয়ার প্রকৃত কারণ এবং তাঁদের কাছ থেকে মুচলেকা গ্রহণের আইনগত ভিত্তি। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, তাঁদের বিরুদ্ধে কোনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা ছিল কি না, থাকলে অভিযোগের বিষয়বস্তু কী ছিল এবং তাঁদের থানায় নেওয়ার পর কোন প্রক্রিয়ায় মুচলেকা গ্রহণ করা হয়েছে? এসব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া অসন্তোষ দূর হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।

ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, তাঁরা কোনো আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন না। ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিবিধান মেনে চলার বিষয়েও তাঁরা গুরুত্ব দিতে চান। তবে কোনো অনিয়ম বা আইনগত জটিলতা থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের কারণে নির্মাণকাজে যুক্ত নিরপরাধ পেশাজীবীদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।

এ অবস্থায় হাজারীবাগ থানা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, কী অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারকে থানায় নেওয়ার নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, তাঁদের কাছ থেকে মুচলেকা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল এবং এ ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।

পাশাপাশি পারিবারিক সম্পত্তি ও নির্মাণসংক্রান্ত বিরোধে কোনো পক্ষ যেন ব্যক্তিগত স্বার্থে পুলিশকে ব্যবহার করে অন্য পক্ষকে হয়রানি করতে না পারে, সে বিষয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বজায় রাখতে প্রতিটি পদক্ষেপে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

সচেতন মহলের প্রত্যাশা, হাজারীবাগের এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য গ্রহণ, প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই এবং প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানের মাধ্যমে সঠিক চিত্র সামনে আসবে। একই সঙ্গে পারিবারিক বিরোধের আড়ালে কোনো ধরনের হয়রানি বা ক্ষমতার অপব্যবহার হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *