মামলা বানিজ্য ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে বিতর্কিত সাখাওয়াত-টিপু

স্টাফ রিপোর্টার: 

নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে চরম বিতর্ক সৃষ্টি করেছে সাখাওয়াত ও টিপু নামে দুই পরিচিত নেতা। স্থানীয় ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ এবং দলীয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা কৌশলগতভাবে মামলা বানিজ্য এবং চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকা অর্জন করেছে। তাদের কুপ্রভাবের কারণে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাদের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মনোনয়ন দিতে ব্যর্থ হয়।

প্রথমে ১ ডিসেম্বরের ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। ধামগড় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি জাহিদ খন্দকার এবং মুছাপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি তাঁরা মিয়া জহিদ্দার বিল এলাকায় সেচ প্রকল্পের দখলে প্রবেশ করেন। সেখানে মাকসুদের বোন পরিচয় প্রদানকারী লাভলী মেম্বার এবং তার স্বামী আমান উল্লাহ পূর্বেই সাখাওয়াতের সমর্থনে প্রকল্পের কাজ চালাচ্ছিলেন। জাহিদ ও তাঁরা মিয়া দখলের চেষ্টা শুরু করলে, মাকসুদের লোকজন তাদের আটকিয়ে পিটিয়ে পুকুরে ফেলে চুবিয়ে দেয়। পেছনে সমর্থন যুগিয়েছে সাখাওয়াতের অনুগামী শাহিন, মোহসীন ও তাওলাদ হোসেন।

এদিকে, গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর বন্দরে নূর হোসেনের কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিলেন টিপুর ঘনিষ্ঠ যুবদল নেতা সম্রাট হাসান সুজন। সেই বিকেলে টিপু বন্দরে গেলে নূর হোসেন ও তার লোকজন টিপুকে গণপিটুনি দেয়। টিপু ও সুজনসহ চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে নূর হোসেনের ভাই শাহাদাত হোসেন কোর্টে চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেছেন।

নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায়ও টিপু ও সাখাওয়াতের ঘনিষ্ঠজনরা মামলা বানিজ্যের সিন্ডিকেট তৈরি করেছে বলে অভিযোগ আছে। মহানগর বিএনপির সদস্য রফিক আহমেদ, সাখাওয়াতের ঘনিষ্ঠ আনোয়ার প্রধান, আবু রায়হান, শাহিন খান (ওরফে বরিশাইল্লাহ শাহিন), বারী ভুঁইয়ার ছেলে আশরাফুল ভুঁইয়া গত ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মামলায় আসামী করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। এছাড়া, আসামীদের খালাস পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাদীপক্ষের হলফনামা কোর্টে দাখিল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা অভিযোগ করেছেন যে, কোর্টপাড়ায় এসব অপকর্মের জন্য সাখাওয়াত ও টিপু দায়ী। এ কারণে তাদের মনোনয়ন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে হাতছাড়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তারা নগরের ফুটপাত, জেনারেটর, ইন্টারনেট, সিএনজি অটো ও প্রাইভেটকার স্ট্যান্ড, ট্রাক স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন ব্যবসায়িক ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি চালাচ্ছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন—টিপু ও সাখাওয়াত কীভাবে এত অল্প সময়ে এত সম্পদের মালিক হলো।

পপার্স লিগ্যাল এইড ফাউন্ডেশন-এর মহাসচিব এডভোকেট অলিউল ইসলাম এবং কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক সাংবাদিক সুলতান মাহমুদ জানিয়েছেন, তারা দুদকের চেয়ারম্যানকে আহবান জানিয়েছেন যাতে টিপু ও সাখাওয়াতের ট্যাক্স ফাইল চেক করা হয়। তাদের বক্তব্য, যদি এই সম্পদের উৎস যাচাই না করা হয়, তাহলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের ক্ষতি হতে পারে।

সাখাওয়াত ও টিপুর কুপ্রভাব শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ অনুযায়ী, তারা রাজনৈতিকভাবে স্থানীয় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। মামলার সুবিধা এবং ভুয়া হলফনামার মাধ্যমে অসংখ্য ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছে। এতে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে এবং স্থানীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

স্থানীয়রা বলছেন, নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়া এখন একটি ‘মামলা বানিজ্য’ কেন্দ্রের আকার ধারণ করেছে। কেউ কোনো মামলা করতে গেলে তা বড় আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সমাধান হয়। ফলে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচারের পরিবর্তে ভয় ও আর্থিক চাপের মধ্যে পড়ে।

উল্লেখযোগ্য, সাখাওয়াত ও টিপুর বিরুদ্ধে স্থানীয় ব্যবসায়ী, দলীয় নেতা ও সাধারণ মানুষ বহুবার অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাদের চাঁদাবাজি ও মামলা বানিজ্যের খবর স্থানীয় সংবাদমাধ্যমেও প্রচারিত হয়েছে। তবে যেসব মামলার সূত্রে তারা অর্থ উপার্জন করেছে, তা যথাযথভাবে তদন্তের আওতায় আনতে এখনও কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

বিএনপির এক কেন্দ্রীয় নেতা সাংবাদিকদের জানান, সাখাওয়াত ও টিপু দলের মধ্যেও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তাদের অপকর্মের কারণে দলীয় মনোনয়ন থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অনেক স্থানীয় নেতার মধ্যে ক্ষোভ ও নৈরাশ্য দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি দলকে অস্থিতিশীল করতে পারে, এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করা হচ্ছে।

একইসাথে, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ মনে করছেন, টিপু ও সাখাওয়াতের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে, নারায়ণগঞ্জে চাঁদাবাজি ও মামলা বানিজ্যের সংস্কৃতি আরও দীর্ঘদিন ধরে চলবে। স্থানীয় আদালতপাড়া, ফুটপাত, স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন জায়গায় তাদের নিয়ন্ত্রণ স্বাভাবিক জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় নাগরিক, ব্যবসায়ী ও দলীয় নেতারা ন্যায্য তদন্ত ও কঠোর পদক্ষেপের জন্য প্রশাসন ও দুদককে আহবান জানিয়েছেন। তাদের মতে, সাখাওয়াত ও টিপুর আয়ের উৎস, চাঁদাবাজি এবং মামলা বানিজ্যের প্রক্রিয়া খতিয়ে না দেখা হলে, নারায়ণগঞ্জবাসীর ওপর আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব অব্যাহত থাকবে।

নগরবাসী প্রশ্ন তুলছেন, এত অল্প সময়ে এত সম্পদ অর্জন সম্ভব কীভাবে, আর সরকারের কোর্ট ও প্রশাসন কেন এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এই বিষয়টি স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গন ও ব্যবসায়িক পরিবেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিস্থিতি এখন এমন যে, সাখাওয়াত ও টিপুর কর্মকাণ্ড শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে নারায়ণগঞ্জকে অস্থিতিশীল করছে। প্রশাসন, দলীয় নেতৃত্ব এবং স্থানীয় নাগরিকরা একযোগে কাজ না করলে এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করা সম্ভব নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *