মোহাম্মদ সোহেল:
চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার কাটিরহাট এলাকায় সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চোরাই ও অবৈধ মাটি কাটার ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে। কাটিরহাটের উত্তর পাশে ধলই পুলসংলগ্ন পূর্ব এলাকায় স্থানীয়দের ভাষ্যমতে প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত টানা চলে মাটি কাটার কাজ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় ২৮ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র নির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে। গভীর রাতে ভারী যন্ত্রপাতি ও ট্রাক ব্যবহার করে কৃষিজমি, খালপাড় ও সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশ থেকে মাটি কেটে দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়, যাতে দিনের আলোতে কোনো আলামত না থাকে।
সরকারি বিধি অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া মাটি কাটা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্যে এই কর্মকাণ্ড চলায় এলাকাবাসীর প্রশ্ন—
প্রতিদিন রাতভর মাটি কাটা হলেও প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কোথায়?
ধলই খালের সুইচগেট হুমকিতে
অবৈধ মাটি কাটার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—চক্রটি লক্ষ্যবস্তু করেছে ধলই খালের সুইচগেট এলাকা। এই সুইচগেটের মাধ্যমেই আশপাশের বিস্তীর্ণ কৃষিজমির পানি নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কিন্তু সুইচগেটের চারপাশের মাটি কেটে ফেলায় খালপাড় দুর্বল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যাহত হলে হাজার হাজার একর ফসলি জমি তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
প্রশাসনের বক্তব্য
এ বিষয়ে হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইনু মহোদয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,
“মাটি কাটার বিষয়টি আমার জানা নেই। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে অবশ্যই অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
তবে এলাকাবাসীর দাবি, এই অবৈধ মাটি কাটার বিষয়ে ইতিপূর্বে একাধিকবার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলেও বাস্তবে কার্যকর কোনো অভিযান হয়নি।
আইনজীবী বিশেষজ্ঞদের মতামত
এই বিষয়ে চট্টগ্রামের একাধিক সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলা হলে তারা জানান,
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫,
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত)
এবং দণ্ডবিধি অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া মাটি কাটা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।
আইনজীবী ব্যারিস্টার (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন,
“সরকারি খাল, সুইচগেট বা কৃষিজমির আশপাশ থেকে মাটি কাটা শুধু পরিবেশ ধ্বংস নয়, এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতি। এ ধরনের অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে জেল, অর্থদণ্ড এবং যন্ত্রপাতি জব্দের বিধান রয়েছে।”
আরেক সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ — বলেন,
“যদি প্রশাসন জেনেশুনে ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে সেটিও দায়িত্বে অবহেলার শামিল। প্রয়োজনে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করার সুযোগ রয়েছে।”
কঠোর ব্যবস্থার দাবি
সচেতন মহল ও স্থানীয়দের দাবি—অবিলম্বে
রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত চলা অবৈধ মাটি কাটার স্থানগুলোতে অভিযান,
জড়িত চক্রকে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার,
ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি ও যানবাহন জব্দ,
এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
তা না হলে হাটহাজারীর এই চোরাই মাটি ব্যবসা পরিবেশ, কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে, যার দায় শেষ পর্যন্ত প্রশাসনকেই নিতে হবে—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।