স্টাফ রিপোর্টার:
আমেরিকার যৌন কেলেংকারির আলোচিত মুখ কুখ্যাত জেফরি এপস্টেইনের নতুন সংস্করণ আবির্ভূত হয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে। বহু বিবাহ, মুতা বিবাহ, অসংখ্য নারী কেলেংকারীর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের “এপস্টেইন” আখ্যা পেয়েছেন আহসান হাবীব।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পতিত স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসর ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীব নারী কেলেংকারীর পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। যা তার জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আহসান হাবীব ও তার পরিবারের সদস্যদের জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে সম্পদের অনুসন্ধান করলে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যাবে।
সূত্র মতে, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঠাকুরগাঁও নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আহসান হাবীব কাজ না করিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স এন কে কর্পোরেশনকে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিল প্রদান করেছেন। মোঃ আহসান হাবীব নোয়াখালী জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে “সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ” প্রকল্প থেকে হাতিয়া উপজেলায় মেসার্স এন কে কর্পোরেশন ২ কোটি ৯৯ লাখ ৩১ হাজার ৩৫৫ টাকার কার্যাদেশ প্রদান করেন। উক্ত কাজের প্যাকেজে টেস্ট টিউবওয়েল, প্রোডাকশন টিউবওয়েল, ওভারহেড ট্যাংক, পাইপলাইন ও ট্রিটমেন্ট প্লান্টের কার্যাদেশ ছিল। এ সকল কাজের ব্যয় ধরা ছিল ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজ না করিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আহসান হাবীব ওই প্রতিষ্ঠানটিকে কাজের সম্পূর্ণ বিল ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রদান করেন।
এ বিষয়ে আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ১২-০৬-২০২৪ তারিখে ৩৬০৫ স্মারক মূলে প্রকল্প পরিচালক মোঃ হানিফ স্বাক্ষরিত দুই সদস্যের একটি পরিদর্শন টিম গঠন করা হয়। উক্ত টিমকে মাঠ পর্যায়ের কাজ পরিদর্শন করে ২৫-০৬-২০২৪ তারিখের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। চিঠিতে এম বি, বিলের কপি, মালামাল পরীক্ষা রিপোর্ট ও পানি টেস্ট রিপোর্টসহ প্রয়োজনীয় সকল কাগজপত্র সংগ্রহ করতে বলা হয়েছিল।
এখানেই নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীবের দুর্নীতির শেষ নয়। তিনি পাবনায় কর্মকালীন সময়ে সরকারি অর্থ লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন। দুর্নীতির অভিযোগে পাবনা দুর্নীতি দমন কমিশনে তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এছাড়া সরকারি কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তথ্য গোপন করে সরকারের অনুমতি ব্যতীত অননুমোদিতভাবে বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। তার পাসপোর্ট পর্যালোচনা করলে বিষয়টি বেরিয়ে আসবে।
অবৈধভাবে উপার্জিত কালো টাকা দিয়ে বিদেশ ভ্রমণের পাশাপাশি নারীর পিছনে ব্যয় করেছেন। সরকারি অনুমতি ছাড়া তৃতীয় বিয়ে করেছেন। গোপনে একাধিক মুতা বিবাহ (অস্থায়ী বিবাহ) করেছেন। ডাক্তার সুমনা ইসলাম নামে এক নারীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তিনি এই তৃতীয় বিয়ে করেছেন। নেত্রকোনায় নির্বাহী প্রকৌশলী দায়িত্বকালীন সময়ে তার তৃতীয় স্ত্রী ডাক্তার সুমনা ইসলামের নামে “বাসুকা কর্পোরেশন” নামীয় লাইসেন্স করিয়ে ওই লাইসেন্সে স্ত্রীকে তারই স্বাক্ষরে নেত্রকোনায় ১ কোটি ৩১ লাখ ২৭ হাজার ৩০০.৯০ টাকার নলকূপ বসানোর কার্যাদেশ দিয়েছেন।
প্রকৌশলী আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ থাকায় ০৯-০৫-২০২২ তারিখে রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। তবে বরখাস্তের বেশি দিন তার চাকুরি থেকে বহিষ্কার থাকা হয়নি। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার লুটপাটের রাজ্যের অংশীদার প্রকৌশলী আহসান হাবীব অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে নোয়াখালীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বসে যান। কীভাবে তার বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার হলো বা কীভাবে তিনি আবার চাকুরিতে ফিরে এলেন তা রহস্যের আড়ালে।
বরখাস্তের পর নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী হয়ে তিনি পুনরায় নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। এন কে কর্পোরেশনকে কাজ ছাড়াই ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার বিল দিয়েছেন। এই ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠায় তাকে নোয়াখালি থেকে ঠাকুরগাঁওয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে বদলি করা হয়। ঠাকুরগাঁওয়েও তিনি নারী কেলেংকারি ও আর্থিক অনিয়মের সাথে জড়িত হয়েছেন।
তার চাকুরিজীবনে যেখানে দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই সরকারি অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠে। প্রকৌশলী আহসান হাবীব তার নিকট আত্মীয়দের নামে লাইসেন্স করে অধিকাংশ সময় সেই লাইসেন্সে কাজ দিয়ে সরকারি অর্থ লোপাট করেন। অন্য লাইসেন্সে কাজ দিলেও সেই ঠিকাদারের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন করেন। তিনি এখন শত কোটি টাকার মালিক।
প্রকৌশলী আহসান হাবীব শুধু সরকারি অর্থ লুটপাটের ক্ষেত্রেই ভয়ংকর নন, পারিবারিক জীবনেও তিনি ভয়ংকর। প্রেমের ফাঁদে বিয়ে করা তার তৃতীয় স্ত্রী ডাক্তার সুমনা ইসলামকে তিনি গর্ভকালীন অবস্থায় নানাভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করেছেন। ডাক্তার সুমনা ইসলামের সাথে যৌথ মালিকানায় একটি ফ্ল্যাট কিনে আইনগত প্রক্রিয়ায় তার অংশ ডাক্তার সুমনা ইসলামকে বুঝিয়ে দিলেও এখন আবার মালিকানা দাবি করছেন। ডাক্তার সুমনা ইসলামকে ফ্ল্যাট থেকে উচ্ছেদ করতে হয়রানি মূলক মামলাসহ সন্ত্রাসী পাঠিয়ে জীবননাশের হুমকি দিয়েছেন। এ বিষয়ে ডাক্তার সুমনা ইসলাম রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় একাধিক সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের “এপস্টেইন” খ্যাত নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীবের যৌন কেলেংকারি, অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান ও ব্যবস্থা গ্রহনের দাবিতে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগের পাহাড় জমেছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে তার বিরুদ্ধে এখনো কোন আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।