স্টাফ রিপোর্টার:
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারি (মিউটেশন) প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম, হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সেবাগ্রহীতাদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফি থাকা সত্ত্বেও একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র এবং কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে। এতে করে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
স্থানীয়দের দাবি, নামজারির আবেদন করতে গিয়ে প্রথম ধাপে অফিসে ফাইল জমা দিলেও নানা অজুহাতে তা দীর্ঘদিন আটকে রাখা হয়। কাগজপত্রে ত্রুটি আছে, তদন্ত প্রয়োজন, বা উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন লাগবে—এমন বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সেবাগ্রহীতাদের ঘুরানো হয়। পরে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার আশ্বাস দিয়ে দালালদের মাধ্যমে টাকা দিলে তবেই ফাইল এগোয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
একাধিক ভুক্তভোগী জানান, ভূমি অফিসে গেলে স্বাভাবিক নিয়মে কাজ করাতে গেলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ঘুরতে হয়। কিন্তু একই কাজ দালালের মাধ্যমে করলে এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই সম্পন্ন হয়। তবে এর জন্য সরকারি ফি’র বাইরে কয়েক গুণ বেশি অর্থ দিতে বাধ্য হতে হচ্ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “নামজারি করতে গেলে বলা হয় ফাইলের সমস্যা আছে। পরে দালালের মাধ্যমে গেলে সব ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু তখন দ্বিগুণ বা তিনগুণ টাকা দিতে হয়। না দিলে ফাইল পড়ে থাকে।”
আরেকজন সেবাগ্রহীতা জানান, তিনি জমির নামজারির জন্য আবেদন করে কয়েক সপ্তাহ ঘুরেও কোনো অগ্রগতি পাননি। পরে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করার পর অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হয়। তিনি বলেন, “এটা এখন সিস্টেম হয়ে গেছে, টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না।”
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে এই অনিয়ম চললেও প্রশাসনিক পর্যায়ে কার্যকর নজরদারি না থাকায় দালালচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কিছু অফিস কর্মচারী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই দালালচক্রের সঙ্গে যুক্ত, যার কারণে সাধারণ মানুষ সঠিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তারা আরও বলেন, ভূমি অফিসে ডিজিটাল সেবা চালু থাকলেও বাস্তবে এর সুফল সাধারণ মানুষ পুরোপুরি পাচ্ছে না। অনলাইন আবেদন থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে অফলাইন প্রক্রিয়ার নামে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নামজারি একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে স্বল্প ফিতে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা। এতে ভূমি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে এবং সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
এদিকে স্থানীয় সামাজিক ও নাগরিক সংগঠনগুলো দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে, ভূমি অফিসে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি, নিয়মিত অভিযান এবং দালালচক্রের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এ বিষয়ে জীবননগর উপজেলা ভূমি অফিসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক এবং দোষীদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে সাধারণ মানুষ হয়রানি ছাড়াই তাদের ন্যায্য সরকারি সেবা পেতে পারে।
স্থানীয়দের মতে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে ভূমি সেবার এই সংকট আরও গভীর হবে এবং জনগণের ভোগান্তি বাড়তেই থাকবে।