মোঃ আব্দুল গফুর সিকদার:
ভোলার মনপুরা উপজেলার উপকূলীয় এলাকায় আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ পাচারচক্র। মাছ ধরার ট্রলারের আড়ালে জ্বালানি তেল, নির্মাণসামগ্রী ও চাল-ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে পাচারের অভিযোগ উঠেছে একাধিক সেরাং ও মাঝির বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের দাবি, পাচার শেষে ট্রলারগুলো দেশে ফিরে আসার সময় সঙ্গে করে নিয়ে আসছে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য।
স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সক্রিয় পাচারচক্রের সঙ্গে বর্তমানে অন্তত ১১ জনের নাম উঠে এসেছে। তারা হলেন—খলিল মাঝি, মজিদ মাঝি, নুর ইসলাম, মালেক মাঝি, হান্নান মাঝি, নুরনবী মাঝি, সিরাজ মাঝি, রাকিব, জহির সেরাং, আলমগীর মাঝি, আবুল মাঝি ও জাহাঙ্গীর মাঝি। অভিযুক্তরা সবাই মনপুরা উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। পেশায় জেলে হলেও তারা দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রপথ ব্যবহার করে গোপনে এই পাচার বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, চক্রটি নোয়াখালীর হাতিয়া এলাকা থেকে জ্বালানি তেল ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য সংগ্রহ করে মনপুরার উপকূল হয়ে রাতের আঁধারে নিঝুম দ্বীপের পূর্ব পাশে অবস্থিত ‘দমার চর’ এলাকায় নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে শুল্ক-কর ফাঁকি দিয়ে পণ্যগুলো মিয়ানমারে পাচার করা হয়। বিনিময়ে পাচারকারীরা মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফিরতি পথে এসব ট্রলারে মাদক আনা হয়, যা পরে স্থানীয় ডিলারদের কাছে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি করা হয় বলে দাবি একাধিক সূত্রের।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে সীমিত আকারে শুরু হলেও বর্তমানে দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় এই পাচারচক্রের সদস্য সংখ্যা বেড়েছে। গত চার মাস ধরে মাছ ধরার আড়ালে চক্রটি আরও সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জেলে জানান, গত ৯ মে দিবাগত রাতে মনপুরার তালতলা এলাকা থেকে মজিদ সেরাং ও জহির সেরাংয়ের ট্রলারসহ কয়েকটি ট্রলার মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। এছাড়া ১২ এপ্রিল রাতে জনতা বাজার মৎস্যঘাট এবং ১৩ এপ্রিল সন্ধ্যায় চরফ্যাশনের সামরাজ মৎস্যঘাট থেকেও একাধিক ট্রলার পণ্য নিয়ে যাত্রা করে বলে তিনি দাবি করেন।
বোটের সেরাংদের কাছে তেল বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ফুহাদ বলেন,
“আমি দোকানদার হিসেবে তেল বিক্রি করি। মাঝিরা সাগরে মাছ ধরার কথা বলে তেল নেয়। পরে যদি তারা পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকে, সেটার দায় তো আমি নিতে পারি না। আমি বিক্রি না করলেও অন্য ব্যবসায়ীরা তেল বিক্রি করবে। প্রতি মৌসুমে আমি ৯-১০টি ট্রলারে তেল সরবরাহ করি।”
তবে অভিযুক্ত কয়েকজন সেরাংয়ের মুঠোফোন বন্ধ থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, হাতিয়া কোস্টগার্ড ইতোমধ্যে পাচারকারী চক্রের কিছু ট্রলার ও মালামাল জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে। তবে পুরো উপকূলজুড়ে নিয়মিত টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, মনপুরা সমুদ্রপথ-নির্ভর এলাকা হওয়ায় নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের কঠোর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। কোনো জেলে বা ট্রলারচালক পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।