উত্তরায় রাজউকের ২০ কোটির জমি দখল করে বিএনপির কার্যালয়, বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দিল রাজউক 

 

স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকার উত্তরায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অন্তত ২০ কোটি টাকা মূল্যের জমিতে গড়ে ওঠা বিএনপির কার্যালয়, দোকানপাট ও বসতঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগে জমিটি ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। সরকার পতনের পর সেটি চলে যায় বিএনপির দখলে। অভিযোগ রয়েছে, এই দখলবাজির সুযোগে মাঝখান থেকে রাজউকের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তাও নানাভাবে ফায়দা লুটেছেন।

সোমবার (৮ জুন) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ২৪ নম্বর সড়কের ১৭/বি নম্বর প্লটে পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে দীর্ঘদিনের এই অবৈধ দখলের অবসান ঘটানো হয়।

যে জমি ঘিরে এত কাণ্ড,স্থানীয়রা  জানান, উত্তরার এই এলাকায় প্রতি কাঠা জমির বাজারমূল্য দুই থেকে তিন কোটি টাকা। রাজউক পাঁচ কাঠার খালি প্লট এবং পাশের প্রায় পাঁচ কাঠার গ্রিন জোন (খাস জমি) মিলিয়ে মোট যে জমি দখলমুক্ত করেছে, তার আনুমানিক বাজারমূল্য অন্তত ২০ কোটি টাকা।

সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, এই মূল্যবান সরকারি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছিল প্রায় অর্ধশত দোকান। এর মধ্যে ছিল চায়ের দোকান, টেইলার্সের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, গ্যাস সিলিন্ডারের গুদামঘর এবং বসতবাড়িও।

 

আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপির হাতে,জানা গেছে, তুরাগ থানা বিএনপির সদস্য ও ৫৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি আমির হোসেনের নেতৃত্বে এখানে দলীয় কার্যালয় গড়ে তোলা হয়। তিনি ও তাঁর লোকজনের পূর্ণ কব্জায় চলে যায় পুরো জমি।

এখানে ভাড়া নিয়ে চায়ের দোকান পরিচালনা করছিলেন মো. দুলাল। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের দখলে ছিল। সরকার পতনের পর বিএনপির লোকজন দখলে নেয়। এখানে বিএনপির দুটি অফিস ছিল  একটিতে কার্যক্রম চললেও আরেকটি সবসময় তালাবদ্ধ থাকত।” দোকানের ভাড়া প্রসঙ্গে তিনি জানান, এলাকার কাশেম নামের এক ব্যক্তির কাছে ভাড়া দিতে হতো।

ওই এলাকার বিএনপি কর্মী মো. আশিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, “বিএনপির নেতারা এখানে দখল নিয়ে অফিস করেছেন। কিন্তু আমাদের এমপি সাহেব অনুমতি দেননি। আগে আওয়ামী লীগের নেতাদের দখলে ছিল। ৫ আগস্টের পর ভেঙে ফেলা হয়েছিল। পরে বিএনপির লোকজন এখানে অফিস করেছে। তবে অফিসে কেউ কোনো দিন বসেননি।”

একই এলাকার বিএনপি কর্মী ওমর আলী এশিয়া পোস্টকে অকপটে স্বীকার করেন, “আগে আওয়ামী লীগের অফিস ছিল। তারা পালিয়ে যাওয়ার পর আমরা দখল করেছি।”

প্রতি দোকানে মাসে তিন হাজার টাকা চাঁদা,

উচ্ছেদ অভিযানের মধ্যেই বেরিয়ে আসে চাঁদাবাজির চাঞ্চল্যকর তথ্য। দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে বিএনপি কর্মী ওমর আলী বলেন, “দোকানপাটের বিষয়ে আমি সরাসরি জানি না। স্থানীয় যুবলীগের নাছিরের ভাই আলী এটা পরিচালনা করতেন, তিনিই ভালো জানেন।” তিনি জানান, প্রতিটি দোকান থেকে মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা করে তোলা হতো।

দখলকারীর দাবি,  ‘ষড়যন্ত্র করে উচ্ছেদ করা হয়েছে’,

তুরাগ থানা বিএনপির সদস্য আমির হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, “নির্বাচনের আগে আমি এখানে শুধু ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার জন্য অফিস করেছিলাম। এটা আমার কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়।” তিনি অভিযোগ করেন, “রাজউকের লোকজন আমাদের কিছুই জানায়নি। হঠাৎ এসে ভেঙে দিয়েছে। কিছু স্বার্থান্বেষী মহল নিজেরা দখল করে ফায়দা লুটতে রাজউককে দিয়ে এই কাজ করিয়েছে।”

উচ্ছেদ অভিযানে যা হলো,

উচ্ছেদ অভিযানের নেতৃত্ব দেন রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শান্তা রহমান। এ সময় রাজউকের অথরাইজড অফিসার এস এম এহসানুল ইমাম, তুরাগ থানা পুলিশ এবং অতিরিক্ত ফোর্সসহ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

রাজউকের অথরাইজড অফিসার এস এম এহসানুল ইমাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, “এটা রাজউকের জমি। আমরা দখলমুক্ত করেছি।”

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শান্তা রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, “রাজউকের পাঁচ কাঠার খালি প্লট এবং তার পাশের গ্রিন জোনে অবৈধভাবে দখল করে গড়ে ওঠা দোকানপাট ও ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। অভিযানের শুরুতে স্থানীয়রা আমাদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। বিস্তারিত বুঝিয়ে বলার পর তারা সহযোগিতা করেন।”

তিনি আরও জানান, দখলকারীদের মূল দাবি ছিল,  রাজউক থেকে এলে জমি রাজউকের সম্পত্তি শাখাকেই বুঝিয়ে দিতে হবে। সেই নিশ্চয়তা দেওয়ার পর তারা শান্তিপূর্ণভাবে সরে যান।

ম্যাজিস্ট্রেট শান্তা রহমান বলেন, “আমরা ডিমার্কেশন করে খুঁটি দিয়ে জায়গাগুলো আলাদা করে রাজউকের সম্পত্তি শাখাকে বুঝিয়ে দিয়েছি। উচ্ছেদ হওয়া ব্যক্তিরা লিজ পাওয়ার সুযোগ চেয়েছিলেন। তাদের রাজউক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে বলা হয়েছে।”

এবার দায়ীদের বিচার চাই,

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, রাজউকের এই উচ্ছেদ অভিযান নিঃসন্দেহে একটি সাহসী ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তবে শুধু উচ্ছেদেই দায়িত্ব শেষ হওয়া উচিত নয়। যারা বছরের পর বছর ধরে সরকারি জমি দখল করে চাঁদাবাজি করেছেন এবং রাজউকের যেসব কর্মকর্তা এই দখলবাজদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছেন সকলের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় এই জমি শিগগিরই আবার নতুন কোনো দখলদারের হাতে চলে যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তাঁরা।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *