হাটহাজারীতে ওসির বিরুদ্ধে ‘মামলা বাণিজ্যের’ অভিযোগে তোলপাড়

এ এম এম আহসান:

চট্টগ্রামের হাটহাজারী মডেল থানায় একই মাসে একই ধরনের অভিযোগে একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলা দায়েরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। মামলার নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, পৃথক দুই বাদীর করা মামলায় বহু আসামির নাম অভিন্ন। ঘটনাটি ঘিরে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে কথিত ‘মামলা বাণিজ্য’, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলায় জড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়দের একাংশ ও ভুক্তভোগীদের স্বজনরা।

থানার রেকর্ড অনুযায়ী, গত ৪ জুন ২০২৬ তারিখে মো. আরিফ (৩৯)-কে বাদী করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা নম্বর-৯ দায়ের করা হয়। এরপর ২৫ জুন ২০২৬ তারিখে মোহাম্মদ সাহাব উদ্দীন (৩৪)-কে বাদী করে একই আইনের ধারায় মামলা নম্বর-২৭ রুজু করা হয়।

দুই মামলার এজাহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক একই ব্যক্তিকে পুনরায় আসামি করা হয়েছে। অভিযোগের ধরন, আইনের ধারা এবং ঘটনার বর্ণনায়ও রয়েছে উল্লেখযোগ্য মিল। ফলে স্থানীয়দের প্রশ্ন—একই ধরনের ঘটনার জন্য একই মাসে ভিন্ন দুই বাদী দিয়ে একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা দায়েরের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল?

বিতর্ক আরও গভীর হয়েছে দ্বিতীয় মামলার বাদী মোহাম্মদ সাহাব উদ্দীনের বক্তব্যে। তিনি সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, মামলার সব আসামিকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে চেনেন না; স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরামর্শে মামলা করেছেন এবং আসামিদের নামও তাঁকে সরবরাহ করা হয়েছে। তবে তাঁর এই দাবির স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে কয়েকজন আসামির স্বজনদের অভিযোগ, মামলায় যাদের নাম রয়েছে, তাঁদের কেউ ঘটনার সময় দেশের বাইরে ছিলেন, আবার কেউ ঘটনাস্থলে উপস্থিতই ছিলেন না। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্বিচারে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাটহাজারী মডেল থানায় দীর্ঘদিন ধরেই কথিত ‘মামলা বাণিজ্য’ চলে আসছে। তাঁদের ভাষ্য, আর্থিক সুবিধা ও রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে একই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে একাধিক মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আলোচিত দুটি মামলাকে তাঁরা সেই অভিযোগেরই অংশ হিসেবে দেখছেন।

দুটি মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ব্যানারে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগে মিছিল থেকে কোনো ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলা কিংবা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার নির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।

এ ঘটনায় হাটহাজারীতে ব্যাপক অসন্তোষ বিরাজ করছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, প্রকৃত তদন্ত ছাড়াই শুধু নামের তালিকা তৈরি করে মামলা দায়ের করা হলে নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ন হতে পারে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, হাটহাজারী মডেল থানায় বর্তমান ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার যোগদান নিয়েও শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ছিল। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁর আগের কর্মস্থল কক্সবাজারের চকরিয়ায় দায়িত্ব পালনকালে হত্যা, নারী নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও হেফাজতে মৃত্যুসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা উঠে আসে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে তাঁকে প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভের খবরও প্রকাশিত হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় বা নিষ্পত্তির তথ্য এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি।

ঈদগাঁও উপজেলার বাসিন্দা আকতার হোছাইন দাবি করেন, ২০১৩ সালে ঈদগাঁও পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ থাকাকালে মনজুর কাদেরের নেতৃত্বে পুলিশের গুলিতে তাঁর ভাই রশিদ আহমদ নিহত হন। ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় মনজুর কাদের দুই নম্বর আসামি ছিলেন বলেও তিনি দাবি করেন। তবে এই দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার বর্তমান বিচারিক অবস্থান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাটহাজারী মডেল থানার ওসি মনজুর কাদের ভূঁইয়ার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।

আইন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মামলার অভিযোগ কতটা সত্য, তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ এবং আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের আইনি ভিত্তি কতটা গ্রহণযোগ্য—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার একমাত্র আদালতের। তাই আলোচিত দুই মামলার প্রকৃত সত্য বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *