আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
মিয়ানমারের উপকূলে পৃথক দুটি নৌকাডুবির ঘটনায় ৫০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) বলছে, প্রাপ্ত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী নৌকাগুলোতে থাকা অধিকাংশ আরোহী ছিলেন মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা, যারা নিরাপত্তা ও উন্নত জীবনের আশায় সমুদ্রপথে যাত্রা করেছিলেন।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে আইওএম ও ইউএনএইচসিআর জানায়, মিয়ানমারের উপকূলে ৫০০ জনের বেশি আরোহী বহনকারী দুটি নৌকা ডুবে যাওয়ার খবর তাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছে। যদিও ঘটনাগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং হতাহতের সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি, তবুও সম্ভাব্য প্রাণহানির পরিমাণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, নৌকা দুটি জুনের শেষ দিকে সংঘাতকবলিত রাখাইন রাজ্য থেকে যাত্রা শুরু করে। আরোহীদের বেশিরভাগই ছিলেন রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে কয়েকজন বাংলাদেশের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির থেকেও এই ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রায় অংশ নিয়েছিলেন। বর্তমানে কক্সবাজারের শিবিরগুলোতে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
জাতিসংঘ জানায়, প্রায় ২৫০ জন আরোহী নিয়ে যাত্রা করা একটি নৌকার সঙ্গে যাত্রার কিছু সময় পরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্যদিকে প্রায় ২৮০ জন বহনকারী আরেকটি নৌকা গত ৮ জুলাই মিয়ানমারের ইরাবতী উপকূলে ডুবে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইওএম ও ইউএনএইচসিআর বলছে, ঘটনাগুলো নিয়মিত নৌ-চলাচলের মৌসুমের বাইরে ঘটেছে। এ সময় সমুদ্র সাধারণত বেশি উত্তাল থাকে। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টি ও বন্যা পরিস্থিতি সমুদ্রযাত্রাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
সংস্থা দুটি সতর্ক করে বলেছে, এসব তথ্য সত্য প্রমাণিত হলে চলতি বছরের শুরু থেকে আন্দামান সাগর ও বঙ্গোপসাগরে নিখোঁজ বা নিহত বলে ধারণা করা মানুষের সংখ্যা আরও কয়েকশ বেড়ে যাবে। ওই তালিকায় রোহিঙ্গা শরণার্থীর পাশাপাশি বাংলাদেশি নাগরিকও রয়েছেন।
হতাশাকে পুঁজি করছে মানবপাচারকারী চক্র
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার মতে, দীর্ঘদিনের সংঘাত, নিপীড়ন, দারিদ্র্য এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রতিবছর হাজারো রোহিঙ্গা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সক্রিয় মানবপাচারকারী চক্রগুলো জরাজীর্ণ ও অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকায় তাদের যাত্রার ব্যবস্থা করে, যা প্রায়ই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর উত্তর ভারত মহাসাগরে বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রার চেষ্টা করেছিলেন ৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে প্রায় ৯০০ জন নিখোঁজ হন বা প্রাণ হারান। ফলে এই রুট বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী অভিবাসনপথগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান
আইওএম ও ইউএনএইচসিআর বলছে, মিয়ানমারের চলমান সংঘাত, অবনতিশীল মানবিক পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরগুলোতে সীমিত সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগের কারণে আরও বেশি মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় নামতে বাধ্য হচ্ছেন।
সংস্থা দুটি সমুদ্রে নিখোঁজদের সন্ধানে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান জোরদার, নিরাপদ আশ্রয় ও সুরক্ষা নিশ্চিত এবং মানবপাচার ও অবৈধভাবে মানুষ পারাপারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের ভূমিকাকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেছে আইওএম ও ইউএনএইচসিআর। তবে তারা জোর দিয়ে বলেছে, শুধু বাংলাদেশ নয়, শরণার্থী ও আশ্রয়দানকারী জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ধারাবাহিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াও সমান জরুরি।
সূত্র: এএফপি, আইওএম, ইউএনএইচসিআর