কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক, প্রযুক্তিবান্ধব, স্মার্ট ও নাগরিকবান্ধব নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে ওয়ান স্টপ সিটিজেন সার্ভিসভিত্তিক মোবাইল ও ওয়েব অ্যাপ্লিকেশন ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ চালু করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক)। নতুন এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নগরবাসী ঘরে বসেই বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণের পাশাপাশি সরাসরি অভিযোগ, পরামর্শ ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত মতামত জানাতে পারবেন। একই সঙ্গে অভিযোগের অগ্রগতি রিয়েল-টাইমে অনুসরণ করার সুবিধাও থাকবে।
শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুরে চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে অ্যাপটির উদ্বোধন করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিনির্ভর। তাই নাগরিক সেবাকে মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়াই সময়ের দাবি। ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপ সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ।
মেয়র বলেন, “এটি শুধু একটি মোবাইল অ্যাপ নয়, বরং নাগরিক ও সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে একটি কার্যকর ডিজিটাল সেতুবন্ধন। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জরুরি সেবা, মেয়রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, নাগরিক অভিযোগ ও বিভিন্ন সেবাসংক্রান্ত তথ্য একই জায়গা থেকে পাওয়া যাবে। ফলে সেবা গ্রহণে নাগরিকদের ভোগান্তি যেমন কমবে, তেমনি প্রশাসনের জবাবদিহিতাও বাড়বে।”
তিনি জানান, অ্যাপটিতে আধুনিক অফিসার ড্যাশবোর্ড, ওয়ার্ডভিত্তিক হিট ম্যাপ এবং স্বয়ংক্রিয় টিকিটিং সিস্টেম সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে কোন এলাকায় কী ধরনের সমস্যা বেশি হচ্ছে, তা দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।
ছবি তুলে অভিযোগ, লাইভ ট্র্যাকিং সুবিধা
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নগরবাসী এখন ঘরে বসেই রাস্তা, জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব, ময়লা-আবর্জনা, নর্দমা, সড়কবাতি, ড্রেনেজ সমস্যা-সহ অন্তত ১০টি ক্যাটাগরির যেকোনো সমস্যা ছবি তুলে লোকেশনসহ সরাসরি সিটি কর্পোরেশনকে জানাতে পারবেন।
তিনি বলেন, “শুধু অভিযোগ জানানোই নয়, অভিযোগটি গ্রহণ করা হয়েছে কি না, কাজ চলমান রয়েছে নাকি সমাধান হয়েছে—সবকিছুই নাগরিকরা লাইভ ট্র্যাক করতে পারবেন। এতে সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।”
মেয়র আরও বলেন, কোনো শহরকে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে শতভাগ সুন্দর রাখা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপ সেই অংশগ্রহণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তিনি নগরবাসীকে গুগল প্লে স্টোর ও অ্যাপ স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড করে ব্যবহার করার আহ্বান জানান।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন চট্টগ্রাম থেকেই শুরু হোক
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
তিনি বলেন, “আমি বারবার বলেছি, স্থানীয় সরকারের মেয়র নির্বাচন যেন চট্টগ্রাম থেকেই শুরু হয়। এ বিষয়ে আমি প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি। আমি চাই একটি অংশগ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, যেখানে জনগণ স্বাধীনভাবে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবেন।”
তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। একইভাবে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনও গণতান্ত্রিক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।
ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় সেবায় সীমাবদ্ধতা
ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, নির্বাচিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকায় সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রম পরিচালনায় নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “বর্তমানে আমরা যতটুকু সেবা দিতে পারছি, নির্বাচিত কাউন্সিলর থাকলে তার চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর সেবা দেওয়া সম্ভব হতো। তাই দ্রুত নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, আদালতের রায়ের ভিত্তিতে তিনি মেয়রের দায়িত্ব পালন করছেন। “আমি কোনো অবৈধভাবে বা জোর করে এই দায়িত্ব গ্রহণ করিনি। এটি সম্পূর্ণ বিচারিক আদেশের ভিত্তিতে হয়েছে। আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে কারও আপত্তি থাকলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আদালতের দেওয়া বৈধতা অনুযায়ী চাইলে আমি ২০২৯ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারি। কিন্তু নির্বাচন তফসিল ঘোষণা করা হলে আমি পদত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ নেব। আমি নির্বাচন চাই।”
নাগরিক মতামত ও অনলাইন সেবা এক প্ল্যাটফর্মে
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আশরাফুল আমিন।
তিনি বলেন, মেয়রের দূরদর্শী চিন্তার ফল হিসেবেই ‘আমাদের চট্টগ্রাম’ অ্যাপের বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, নাগরিকরা শুধু অভিযোগই নয়, উন্নয়ন পরিকল্পনা, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, পার্ক, খেলার মাঠ, ফুটওভার ব্রিজ, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও পরামর্শ দিতে পারবেন। পাশাপাশি জনমত জানতে অ্যাপটিতে পোলিং সিস্টেম সংযুক্ত করা হয়েছে।
এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স, হোল্ডিং ট্যাক্স, ওয়ার্ড অফিসের বিভিন্ন সনদের জন্য অনলাইন আবেদন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তথ্য, হাসপাতালের তথ্যসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবাও পর্যায়ক্রমে অ্যাপে যুক্ত করা হবে বলে জানান তিনি।
সিএসআর তহবিলে বাস্তবায়ন
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মো. জানে আলম, ডিআইজি (চট্টগ্রাম রেঞ্জ) মো. মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এবং নগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর।
জানা যায়, কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) তহবিলের আওতায় ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড (ইবিএল) অ্যাপটির অর্থায়ন করেছে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করেছে ভেনটো টেক।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের এই উদ্যোগ নগর সেবাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তুলবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করেন।