মো. রাসেল:
বান্দরবানের লামা উপজেলার ইয়াংছা কাঁঠালছড়া এলাকায় পরিবেশ আইন ও স্থানীয় প্রশাসনকে তোয়াক্কা না করেই দিনের বেলায় চলছে পাহাড় কাটার মহোৎসব। স্থানীয় ‘পি.বি.এন’ (P.B.N) নামের একটি ইটভাটায় ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্বিচারে কাটা হচ্ছে প্রকৃতির এই পাহাড়ি ঢাল। প্রভাবশালী একটি চক্রের এ পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডে চরম হুমকিতে পড়েছে স্থানীয় পরিবেশ, কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কোনো ধরনের বৈধ ছাড়পত্র বা পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়াই ইয়াংছা কাঁঠালছড়া এলাকায় পিবিএন ইটভাটাটি অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ভেকু (মাটি কাটার যন্ত্র) দিয়ে দিনের আলোতেই প্রকাশ্যে পাহাড়ের পর পাহাড় কেটে সাবাড় করা হচ্ছে। কাটা মাটি ডাম্প ট্রাকের মাধ্যমে সরাসরি ইটভাটার ভেতরে স্তূপ করে রাখা হচ্ছে।
ঝুঁকিতে পরিবেশ ও জনপদ
পাহাড় কাটার এই ভয়াবহ চিত্র নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও পরিবেশকর্মীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক প্রবীণ শিক্ষক ও সচেতন নাগরিক বলেন, “দিনের আলোতেই প্রশাসনের নাকের ডগায় ডাম্প ট্রাক ও ভেকু দিয়ে পাহাড় কেটে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা প্রতিবাদ করতে গেলে ইটভাটা কর্তৃপক্ষের প্রভাবশালী সিন্ডিকেট আমাদের নানাভাবে হুমকি দেয়। এভাবে নির্বিচারে পাহাড় কাটলে আগামী বর্ষায় পুরো এলাকায় ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটতে পারে, যা স্থানীয় শত শত পরিবারের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।”
আশপাশের কৃষিজমি নষ্ট হওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কাঁঠালছড়া এলাকার এক স্থানীয় সমাজকর্মী বলেন, “পাহাড় কাটার ফলে বর্ষায় ওপর থেকে নেমে আসা বালু ও মাটি আমাদের উর্বর কৃষিজমি এবং ছড়াগুলো (পাহাড়ি খাল) ভরাট করে দিচ্ছে। কৃষকরা এখন আর জমিতে ঠিকমতো চাষাবাদ করতে পারছেন না। তাছাড়া দিন-রাত ডাম্প ট্রাক চলাচলের কারণে পুরো এলাকার বাতাস ধুলোবালিতে ভরে থাকে। আমাদের সন্তানরা তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছে।”
আইন যা বলে
বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী, কোনো অবস্থাতেই পাহাড় বা টিলার উপরিভাগ, ঢাল কিংবা তৎসংলগ্ন এলাকার মাটি কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ পিবিএন ইটভাটা কর্তৃপক্ষ প্রচলিত সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং জিরো-টলারেন্স নীতির বাস্তবায়ন দাবি করেছেন। তাদের মতে, লোকদেখানো ভ্রাম্যমাণ আদালত বা সামান্য জরিমানা করে এই পাহাড়খেকোদের থামানো সম্ভব নয়। দ্রুত অবৈধ পাহাড় কাটা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে পিবিএন ইটভাটার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া না হলে অচিরেই এ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।