মোঃ রাসেল:
বান্দরবানের লামা বন বিভাগের আওতাধীন মাতামুহুরী রিজার্ভ ও তৈন রেঞ্জে তীব্র জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ দুটি বিটের কর্মকর্তা মারা যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পার হলেও সেখানে নতুন কোনো নিয়োগ না হওয়ায় বনাঞ্চল রক্ষায় চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে বিশাল এই বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, সরকারি বনায়ন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগ। বনকর্মী ও পাহারাদারের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে অরক্ষিত এই বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান বনজ সম্পদ পাচার এবং সরকারি জমি বেদখলের আশঙ্কা করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক বনাঞ্চল মাতামুহুরী রিজার্ভ এবং তৈন রেঞ্জ দীর্ঘদিন ধরে জনবল সংকটে ভুগছে। এর মধ্যে পানবাজার বিট ও আলীকদম বিটের দায়িত্বে একই কর্মকর্তা নিয়োজিত ছিলেন। গত ১৩/০২/২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মারা যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত ওই দুটি বিটে নতুন কোনো কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ফলে বিট দুটি বর্তমানে সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন ও অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।
বর্তমানে বিশাল তৈন রেঞ্জে মাত্র ৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন এবং মাতামুহুরী রেঞ্জেও অনুরূপ সংখ্যক (মাত্র ৮ জন) জনবল বিদ্যমান। দুর্গম পাহাড়ি পথ এবং যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে এই নামমাত্র লোকবল দিয়ে বিশাল বনের সীমানা পাহারা দেওয়া এবং নিয়মিত টহল দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তৈন রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ আরিফ জনবল সংকটের সত্যতা স্বীকার করে জানান, “বিশাল এই রেঞ্জের বনাঞ্চল ও সরকারি সম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্য আমাদের যে পরিমাণ জনবল প্রয়োজন, তার তুলনায় বর্তমানে কর্মরত লোকবলের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। সীমিত জনবল নিয়েও আমরা সাধ্যমতো রিজার্ভ ও বনজ সম্পদ রক্ষায় দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। তবে বনায়ন রক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত এখানে নতুন জনবল নিয়োগ দেওয়া জরুরি।”
একই সংকটের কথা তুলে ধরে মাতামুহুরী বিটের কর্মকর্তা তপন চন্দ্র দাস জানান, “মাতামুহুরী রিজার্ভের বিশাল বনভূমি রক্ষায় বর্তমান জনবল কোনোভাবেই পর্যাপ্ত নয়। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় দিন-রাত টহল দেওয়া এবং নতুন বনায়ন কর্মসূচিগুলো সফলভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করতে আমাদের প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। বনের সম্পদ পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে এবং সরকারি উদ্যোগগুলো সফল করতে দ্রুত শূন্য পদগুলোতে কর্মী নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।”
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এই দুই রেঞ্জের আওতাধীন এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় সামাজিক বনায়ন ও চারা রোপণ কর্মসূচি নেওয়া হলেও তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত লোকবল নেই। ফলে নতুন বনায়ন যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি অসাধু চক্র বনের মূল্যবান গাছ কেটে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে এখানে জনবল নিয়োগ দেওয়া না হলে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা জানান, মাতামুহুরী রিজার্ভ এবং তৈন রেঞ্জ আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি বনাঞ্চল রক্ষা এবং নতুন বনায়ন কর্মসূচি সফল করতে হলে এই দুই রেঞ্জে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দিয়ে টহল জোরদার করা একান্ত প্রয়োজন।
এ বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং ঊর্ধ্বতন বন কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকার সর্বস্তরের জনগণ।