ব্রাহ্মণপাড়ায় মাদকের ভয়ংকর স্পটের নেতৃত্বে চৌকিদার শাহীন

বিশেষ প্রতিনিধি:

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার ১ নম্বর মাধবপুর ইউনিয়নের দইখোলা গ্রামে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, সরকারি ভাতা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার) শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ভুক্তভোগী ও সাধারণ মানুষের বক্তব্যের ভিত্তিতে সরেজমিন অনুসন্ধানে এসব অভিযোগের তথ্য উঠে এসেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গ্রাম পুলিশের দায়িত্বে থাকা শাহীন মিয়া স্থানীয়ভাবে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। ওই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিশেষ করে ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় এলাকাটিতে মাদকের বিস্তার ঠেকাতে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে শাহীন দীর্ঘদিন ধরে এসব কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পরও দইখোলা ও আশপাশের এলাকায় মাদকের বিকিকিনি বন্ধ হয়নি। বরং একটি চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের মাদক সরবরাহ ও বিক্রি করা হচ্ছে। এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে চৌকিদার শাহীন জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

বিধবা ও বয়স্ক ভাতার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, খাদ্যসামগ্রীসহ সরকারি বিভিন্ন সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে অসহায় মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি বিভিন্ন সুবিধা পাওয়ার জন্য দরিদ্র মানুষকে সহযোগিতা করার কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। এমনকি সরকারি প্রকল্পের আওতায় ঘর নির্মাণ বা ঘর মেরামতের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলেও অনেকের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এতে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের অনেকে তাদের শেষ সম্বলটুকুও হারিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।

জমির কাগজপত্র করে দেওয়ার নামে ৫ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ

চৌকিদার শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নকল সংগ্রহ করে দেওয়ার কথা বলে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

দইখোলা গ্রামের বাসিন্দা মানিক মিয়া গত ২৮ জুলাই ২০২৬ তারিখে এ বিষয়ে অভিযোগ করেন বলে জানা গেছে। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, এসিল্যান্ড ও ভূমি অফিস থেকে প্রয়োজনীয় জমির কাগজপত্র সংগ্রহ করে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নেওয়া হয়।

অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে ৩০ জুলাই এসিল্যান্ড কার্যালয়ে শুনানি হয় বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। সেখানে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে নেওয়া পাঁচ লাখ টাকার মধ্যে তিন লাখ টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে অভিযোগকারী পক্ষের দাবি। তবে পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।

এ বিষয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে যথাযথ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

চাঁদাবাজির অভিযোগ

শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে স্থানীয় অটোরিকশাচালকদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের দাবি, গ্রাম পুলিশের পরিচয় ও স্থানীয় প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে অটোচালকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা নেওয়া হয়।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এলাকায় শাহীন মিয়ার প্রভাব এতটাই বেশি যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও অনেকে ভয় পান। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় তার কর্মকাণ্ড আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে দাবি তাদের।

গরু চুরির সঙ্গেও জড়িত থাকার অভিযোগ

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে অন্যের গরু চুরি করে বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও করেছেন। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো মামলা, নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়রা এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ

চৌকিদার শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে ইউনিয়ন পরিষদে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন না করেও সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, তিনি প্রায় এক থেকে দেড় বছর ইউনিয়ন পরিষদে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন না। এরপরও হাজিরা খাতায় তার উপস্থিতি দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা। এ বিষয়ে হাজিরা খাতা, বেতন-ভাতা সংক্রান্ত নথি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকায় দায়িত্ব পালনে অনিয়মের পরও শাহীন গ্রাম পুলিশের চাকরিতে বহাল রয়েছেন।

রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, সাবেক ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছ থেকে শাহীন মিয়া দীর্ঘদিন ধরে সুবিধা পেয়ে আসছেন। ওই রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের।

তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা কারও আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান

চৌকিদার শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুন্নী ইসলামের সঙ্গে সাংবাদিকরা যোগাযোগ করলে তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান।

তিনি বলেন, কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের আওতায় আসতে হবে। মাদকের বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান কঠোর। মাদকের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।

ইউএনও আরও বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

স্থানীয়দের তদন্তের দাবি

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধে প্রশাসনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সমন্বিত অভিযান প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ চৌকিদার শাহীন মিয়ার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারি ভাতা ও সুযোগ-সুবিধার অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা এবং দায়িত্বে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের ভাষ্য, মাদকের ভয়াবহতা থেকে তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করতে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে নিয়মিত অভিযান, মাদক ব্যবসায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় বন্ধ করা জরুরি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *