নিজস্ব প্রতিনিধি: ইসরায়েলে আগামী অক্টোবরের নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। গাজায় চলমান সামরিক অভিযান, ফিলিস্তিনিদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এবং আন্তর্জাতিক চাপের পাশাপাশি দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটই এবারের নির্বাচনে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী ও জনমত জরিপকারীদের মতে, এই নির্বাচন ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সামরিক সেবা এবং ধর্মীয়-ধর্মনিরপেক্ষ বিভাজন নিয়ে ইসরায়েলি সমাজে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
ইসরায়েলি সমাজে বাড়ছে রাজনৈতিক বিভাজন
একসময় ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতিতে ডানপন্থী ও উদারপন্থীদের বড় মতপার্থক্যের জায়গা ছিল ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে অবস্থান এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের সম্ভাবনা। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে ইসরায়েলি রাজনীতিতে বড় ধরনের ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
ফলে এবারের নির্বাচনে অনেক ইহুদি ভোটারের কাছে ফিলিস্তিন ইস্যুর চেয়ে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, বর্তমান জোট সরকারের বৈধতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনি ভোটাররা এমন সরকার প্রত্যাশা করছেন, যারা তাদের এলাকায় সহিংসতা ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল বার-তালের মতে, চরম ডানপন্থী জোট সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং আল্ট্রা-অর্থোডক্স সম্প্রদায়ের সামরিক সেবা এড়িয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। পাশাপাশি প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থায় নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়োগ দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো দুর্বল করার অভিযোগও উঠেছে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে।
৭ অক্টোবরের হামলার দায় কার?
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলা এখনো ইসরায়েলি সমাজের রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলছে। দেশটির গণমাধ্যমে হামলার স্মৃতি নিয়মিত আলোচিত হলেও, এরপর গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পাচ্ছে।
বর্তমান নির্বাচনী বিতর্কে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কিংবা ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সহাবস্থানের প্রশ্ন বড় ইস্যু হয়ে ওঠেনি। বরং ভোটারদের একটি বড় অংশ ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং এর জন্য দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জানাচ্ছে।
বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে সামরিক অভিযান এবং দুর্নীতির মামলাসহ বিভিন্ন কারণে তদন্ত প্রক্রিয়া বিলম্বিত করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সামাজিক বিশ্লেষক ইহুদা শেনহাভ-শাহরাবানির মতে, ইসরায়েলের একটি বড় অংশ এখন নেতানিয়াহুর বিকল্প খুঁজছে। বিরোধী দলগুলোর মধ্যেও নেতানিয়াহুবিরোধী অবস্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐক্যের জায়গা তৈরি করেছে।
বিচার বিভাগ নিয়ে তীব্র দ্বন্দ্ব
ইসরায়েলের রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে বিচার বিভাগ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎ। নেতানিয়াহু সরকারের বিচার বিভাগীয় সংস্কার উদ্যোগকে সমালোচকেরা সরকারের ক্ষমতার ওপর বিচারিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভীরসহ চরম ডানপন্থী নেতারা অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারাভ-মিয়ারার অপসারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের আইনগত বৈধতা তদারকির দায়িত্বে থাকা এই কর্মকর্তার সঙ্গে সরকারের বিরোধও ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন ঘিরে ইসরায়েলের রাজনৈতিক বিতর্ক এখন অনেকটাই অভ্যন্তরীণ সংকটকেন্দ্রিক। ডানপন্থী জোট বিচারব্যবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, আর ধর্মনিরপেক্ষ বিরোধী দলগুলো গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ফিলিস্তিনি নাগরিকরা
ইসরায়েলের প্রধান ইহুদি রাজনৈতিক দলগুলো আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। চরম ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ আরব দলকে নিয়ে জোট গঠনকে ৭ অক্টোবরের হামলার চেয়েও ক্ষতিকর বলে মন্তব্য করেছেন।
বিরোধী নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদ এবং নাফতালি বেনেটও ভবিষ্যতে আরব দলগুলোকে নিয়ে সরকার গঠনের বিষয়ে স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি। অথচ ২০২১ সালে তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে আরব দল রাম অংশ নিয়েছিল।
এ অবস্থায় ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রত্যাশা আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তাদের অভিযোগ, আরব অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সহিংসতা বাড়লেও সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। একই সময়ে দখলকৃত পশ্চিম তীরে উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হাতে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলার ঘটনাও অব্যাহত রয়েছে।
সামরিক সেবা নিয়ে হারেদিদের সঙ্গে বিরোধ
ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যুগুলোর একটি হয়ে উঠেছে আল্ট্রা-অর্থোডক্স বা হারেদি সম্প্রদায়ের সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি।
গাজাসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের সামরিক অভিযানের কারণে সাধারণ ইসরায়েলিদের সামরিক দায়িত্ব ও ঝুঁকি বেড়েছে। এর বিপরীতে হারেদি সম্প্রদায়ের বড় অংশকে সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
হারেদি রাজনৈতিক দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম সামরিক বাধ্যবাধকতার বিরোধিতা করে আসছে। তাদের দাবি, নিয়মিত তোরাহ অধ্যয়ন ইসরায়েলের আধ্যাত্মিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই অবস্থানের প্রতিবাদে জেরুজালেমে হারেদি তরুণদের বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনাও ঘটেছে।
অন্যদিকে দীর্ঘ সময় সামরিক দায়িত্ব পালন করা সাধারণ ইসরায়েলিদের মধ্যে প্রশ্ন উঠছে—একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী কেন একই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাবে। ফলে সামরিক সেবা ইস্যুতে ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ ইসরায়েলিদের বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে।
ফিলিস্তিন ইস্যু কি নির্বাচনে আড়ালেই থাকবে?
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গণতন্ত্র, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব, সামরিক সেবা, সামাজিক মেরুকরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবিষ্যৎই প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে গাজা ও পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিদের জীবন-জীবিকা, স্বাধীন রাষ্ট্রের সম্ভাবনা এবং ইসরায়েলি নাগরিকত্বধারী ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও অধিকার নির্বাচনী আলোচনার মূলধারা থেকে অনেকটাই আড়ালে রয়েছে।
নির্বাচনের ফলাফল ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তবে সেই পরিবর্তন ফিলিস্তিনিদের জন্য নতুন কোনো রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।