স্টাফ রিপোর্টার:
গাজীপুরের শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রায় ৭১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের একটি মর্টগেজ দলিল সম্পাদনকে কেন্দ্র করে সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানা ও তাঁর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বিরুদ্ধে ৭ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দলিল সম্পাদনের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতার কথা বলে প্রথমে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। পরে কয়েক দফা দর-কষাকষির পর ৭ লাখ টাকায় বিষয়টি ‘সমঝোতা’ হয়। যার মর্টগেজ ও পাওয়ার দলিল নং ৭৩৬৪/৬৩৬৫, তারিখ ০৩/০৮/২০২৬-০৪/০৮/২০২৬।
দৈনিক স্বাধীন সংবাদ-এর অনুসন্ধানী টিমের দাবি, ঘটনাটি নিয়ে তারা গোপনে তথ্য সংগ্রহ করেছে। তাদের কাছে সংশ্লিষ্টদের কথোপকথনের কল রেকর্ডসহ বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার একটি কোম্পানির পক্ষ থেকে প্রায় ৭১ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের একটি মর্টগেজ দলিল সম্পাদনের জন্য শ্রীপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানা দলিল সম্পাদনের আগে কোম্পানির নামজারি সংশোধনের বিষয়টি সামনে আনেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রার সংশ্লিষ্ট পক্ষকে বলেন, কোম্পানির চেয়ারম্যান অথবা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নামে চলমান নামজারি সঠিকভাবে সম্পন্ন করে আনতে হবে। অন্যথায় দলিল সম্পাদন করা সম্ভব হবে না। এতে কোম্পানির পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হলেও বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা চলতে থাকে।
একপর্যায়ে সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানা তাঁর পিএস জাহিদের সঙ্গে কথা বলার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পিএস জাহিদসহ কয়েকজনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, শুরুতে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হলেও দীর্ঘ দর-কষাকষির পর ৭ লাখ টাকায় সমঝোতা হয়। এরপর কোম্পানির প্রতিনিধি সোলায়মানের কাছ থেকে ওই টাকা গ্রহণ করেন পিএস জাহিদ, কচুতো ও রায়হান নামে কয়েকজন ব্যক্তি—এমন অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, টাকা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে নতুন করে নামজারি পরিবর্তন করতে হয়নি। অথচ এর আগে নামজারি সংশোধনের বিষয়টি দলিল সম্পাদনের অন্যতম শর্ত হিসেবে সামনে আনা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কোম্পানিটির পক্ষে আগে থেকেই একজনের নামে নামজারি করা ছিল। এরপরও নামজারি পরিবর্তনের কথা বলে দলিল সম্পাদনে জটিলতা তৈরি করা হয় এবং পরে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
গোপনে অনুসন্ধান, রেকর্ড সংগ্রহের দাবি: ঘটনাটির বিষয়ে দৈনিক স্বাধীন সংবাদ-এর একটি অনুসন্ধানী টিম আগে থেকেই তথ্য সংগ্রহ করছিল বলে জানা গেছে। অনুসন্ধানী টিমের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কার্যক্রম, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কথোপকথন এবং অর্থ লেনদেনের বিষয়ে তারা বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে। টিমটির কাছে কল রেকর্ডসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
এদিকে অভিযোগটি জনস্বার্থে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে মানবাধিকার সংস্থা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটি। সংস্থাটির পক্ষ থেকে আইনমন্ত্রী ও আইন সচিব বরাবর লিখিত আবেদন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংস্থাটির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন আকাশ বলেন, “বর্তমান সরকারের আমলে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি করে পার পাবে—এমনটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কেউ কোনো পরিচয় ব্যবহার করে দুর্নীতি করলে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, সরকারি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা ঘুষের শিকার হতে না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানার বাড়ি বগুড়া জেলায়। বগুড়া জেলার সন্তান হওয়ায় তিনি সেবা নিতে আসা মানুষদের উদ্দেশে বলেন, “আমি বগুড়া জেলার রাজা, আমি যা বলব তাই হবে”—এমন দাবিও করা হয়েছে।
অন্যদিকে পিএস জাহিদ ও রায়হান সংশ্লিষ্টদের বলেন, “ভাই, যা হওয়ার হয়েছে, এ বিষয় বাড়াবাড়ির দরকার নেই”—এমন কথোপকথন হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার সোহেল রানা, পিএস জাহিদ, রায়হানসহ অভিযুক্ত অন্যদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।