মো. ইসলাম উদ্দিন তালুকদার ::
চলতি মৌসুমে আশানুরূপ ফলন না পাওয়ায় হতাশ লালমনিরহাটের পাটচাষিরা। উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি পাটের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়েও শঙ্কায় রয়েছেন তারা। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দাম না মিললে এবারও লোকসান গুনতে হবে বলে আশঙ্কা কৃষকদের। এতে আগামী মৌসুমে পাট চাষে আগ্রহ হারাতে পারেন জেলার অনেক কৃষক।
লালমনিরহাটের আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও গ্রামে এবার ব্যাপকভাবে পাটের আবাদ হয়েছে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও সানিয়াজান নদীর চরাঞ্চলের অনাবাদি ও বন্যাপ্রবণ জমিতে পাট চাষে আগ্রহ বেড়েছে কৃষকদের। যেসব জমিতে ধানসহ অন্যান্য ফসল ভালো হয় না, সেসব জমিতেও এবার পাট চাষ করেছেন অনেকে।
তবে মাঠে ফলন কম হওয়ায় কৃষকদের সেই আশায় এখন ভাটা পড়েছে। সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও পাট কাটা ও জাগ দেওয়ার কাজ চলছে, আবার কোথাও পচানো পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত কৃষকরা। কোনো কোনো জমির পাট এখনো পুরোপুরি জাগ দেওয়ার উপযোগী হয়নি।
কৃষকেরা জানান, পাট কাটার পর ডোবা, নালা, পুকুর, খাল-বিল কিংবা জলাশয়ে স্তুপ করে রেখে দেওয়া হয়। সাধারণত ২০ থেকে ২৫ দিন পর পাট পচে গেলে সেখান থেকে আঁশ ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। পরে সেই আঁশ রোদে শুকিয়ে বাজারে বিক্রি করেন কৃষকরা।
পাটচাষিদের ভাষ্য, মৌসুমের শুরুতে খরার কারণে অনেক জমিতে সেচ দিতে হয়েছে। পরে অতিবৃষ্টিতে কোথাও কোথাও জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় পাটের গাছ ঠিকমতো বেড়ে উঠতে পারেনি। পাশাপাশি এবার বিভিন্ন এলাকায় রোগবালাইয়ের প্রকোপও ছিল তুলনামূলক বেশি। এসব কারণে পাটের ফলন আশানুরূপ হয়নি।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে পাটের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় উৎপাদন খরচ তুলতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়েছে। অনেক সময় পাট বিক্রি করে লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হয়েছে। ফলে একসময় যে পাটকে কৃষকের ‘সোনালি আঁশ’ বলা হতো, সেটিই এখন অনেকের কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এবার ফলন কম হওয়ার পাশাপাশি বাজারদর নিয়েও নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, পাট কাটার মৌসুমে স্থানীয় ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। এতে কৃষকরা উৎপাদন খরচের তুলনায় কম দামে পাট বিক্রি করতে বাধ্য হন। পরে সেই পাটই বেশি দামে বিক্রি করে লাভবান হন মধ্যস্বত্বভোগীরা।
পাটচাষিদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনার ব্যবস্থা করা হলে তারা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন। ধান ও গমের মতো পাটের ক্ষেত্রেও সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন তারা।
আদিতমারী উপজেলার পাটচাষি আব্দুল আহাদ বলেন, প্রকৃত পাটচাষিদের প্রশিক্ষণ, উন্নতমানের বীজ ও কৃষি উপকরণ দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। যারা বাস্তবে পাট চাষ করেন, তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া হলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
কালীগঞ্জের কৃষক আব্দুর রাসেল বলেন, ‘পাটের জমিতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় এবার গাছ লম্বা হয়নি। ফলে আঁশও ভালো হয়নি। এবারও আমাদের লোকসানের মুখ দেখতে হবে।’
চরাঞ্চলের কৃষক রমনী কান্ত বলেন, ‘আমরা প্রতিবার আশা নিয়ে পাট চাষ করি, কিন্তু প্রতিবারই লোকসানের মুখে পড়ি। অতিবৃষ্টির কারণে এবার পাটের গাছ আশানুরূপ বড় হয়নি, তাই ফলনও কম হয়েছে। সরকার পাটের দাম নির্ধারণ করে দিলে কিছুটা হলেও ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারব।’
লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মো. মতিউল আলম জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪ হাজার ৪৫ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। এর লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ হাজার ১০ হেক্টর। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩৫ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। তবে অতিবৃষ্টির কারণে এবার ফলন কিছুটা কমেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী মৌসুমে ফলন ভালো হওয়ার আশা রয়েছে।
তিনি জানান, লালমনিরহাটে প্রধানত তোশা, দেশি ও ক্যানাফ—এই তিন ধরনের পাটের চাষ হয়ে থাকে।
কৃষকদের প্রত্যাশা, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় নিয়ে পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পাট কেনার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাহলেই আবারও কৃষকের কাছে ‘সোনালি আঁশ’ হয়ে উঠতে পারে পাট।