‘ডিগ্রি নয়, মানবিকতা ও দেশপ্রেমই শিক্ষার মূল পরিচয়’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

শুধু বই পড়ে জ্ঞান অর্জন কিংবা বড় ডিগ্রি পেলেই প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না বলে মন্তব্য করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি বলেন, শিক্ষার সঙ্গে মানবিকতা, দেশপ্রেম ও সামাজিক দায়িত্ববোধের সমন্বয় ঘটাতে হবে। বড়দের সম্মান, ছোটদের স্নেহ এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি না হলে সেই শিক্ষা সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজে আসে না।

শুক্রবার (২৮ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি কনভেনশন সেন্টারে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বইপড়া কর্মসূচির পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বইপড়া কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কৃতিত্ব অর্জনকারী শিক্ষার্থীদের পুরস্কৃত করতে দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে জেলা প্রশাসক বলেন, মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বইয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বই মানুষকে অতীতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, বর্তমানকে বুঝতে শেখায় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিকল্পনা করতে সহায়তা করে।

বর্তমান বিশ্ব অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনগোষ্ঠী। প্রতিটি মানুষকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করতে পারলেই দেশ দ্রুত এগিয়ে যাবে।

শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য তুলে ধরে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার মাধ্যমে শুধু সামনের চোখ নয়, মনের চোখও খুলতে হবে। যে শিক্ষা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে, বড়দের সম্মান করতে এবং ছোটদের ভালোবাসতে শেখায়—আমরা সেই শিক্ষায় শিক্ষিত হতে চাই।

সমাজে ক্রমবর্ধমান আত্মকেন্দ্রিকতা ও স্বার্থপরতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ও দেশকে ভালো না রেখে কোনো ব্যক্তি একা ভালো থাকতে পারেন না। অর্জিত শিক্ষা যদি সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজে না লাগে, তাহলে বড় ডিগ্রি বা সনদও একজন মানুষকে স্মরণীয় করে রাখতে পারে না।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পেছনে অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, নতুন প্রজন্মকে সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী নিরাপদ, মানবিক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলার দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মকেই নিতে হবে।

প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রযুক্তি একদিকে কার্যকর সেবক, অন্যদিকে অসচেতন ব্যবহারে বিপজ্জনক প্রভুও হয়ে উঠতে পারে। তাই বই পড়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন এবং এর নিরাপদ ও ইতিবাচক ব্যবহার সম্পর্কে জানতে হবে।

দেশের মেধাবী তরুণদের উদ্দেশে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, তাদের মেধা ও দক্ষতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগাতে হবে। দেশপ্রেম, মানবিকতা ও আধুনিক জ্ঞানের সমন্বয়ে নিজেদের প্রস্তুত করে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে আরও শক্ত অবস্থানে নিয়ে যেতে হবে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গত ৪৮ বছর ধরে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশব্যাপী বইপড়া কর্মসূচি পরিচালনা করছে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১ হাজার ৪০০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দেড় লাখ শিক্ষার্থী এ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত।

২০২৫ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম নগরের ১০১টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ১৩ হাজার শিক্ষার্থী এ কর্মসূচিতে অংশ নেয়। তাদের মধ্যে মূল্যায়নে কৃতিত্ব অর্জনকারী ৫ হাজার ৮৯৬ শিক্ষার্থীকে দিনব্যাপী উৎসবের দুটি পর্বে পুরস্কৃত করা হয়।

অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. বিল্লাল হোসেন খান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক, বিশিষ্টজন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *