‘অন্তর্বর্তী সরকার সাত দিনে পারলে ছয় মাসেও আমরা কেন পারব না?’

নিজস্ব প্রতিবেদক:

শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজীকরণ নিয়ে জাতীয় সংসদে প্রশ্ন তুলেছেন বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যদি এক বা সাত দিনের মধ্যে এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারে, তাহলে বর্তমান সরকারের ছয় মাস পার হলেও কেন প্রক্রিয়াটি সহজ করা যাচ্ছে না?

রোববার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাব ও সম্পূরক প্রশ্নে এ নিয়ে আলোচনা হয়।

মো. মোশারফ হোসেন ৭১ বিধিতে দেওয়া নোটিশে শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজীকরণের দাবি জানান। তিনি জানতে চান, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকারকে আর কত সময় লাগবে।

জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান বলেন, জনগণের স্বার্থে বিষয়টি সরকার বিবেচনায় রেখেছে। তবে আইন ও বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থা, জেলা-উপজেলা এবং অন্যান্য ক্রয়কারী কার্যালয় থেকে বিদ্যমান পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০২৫ অনুযায়ী ক্রয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি জানান, সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে মূলত দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এর একটি সীমিত দরপত্র পদ্ধতি বা এলটিএম, যার নির্ধারিত প্রাক্কলিত মূল্য সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। অন্যটি উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বা ওটিএম, যা যেকোনো মূল্যের জন্য প্রযোজ্য।

ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজীকরণের প্রস্তাবের বিষয়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ এবং জনগণের স্বার্থে আমরা বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি। যথাসময়ে প্রয়োজনে সেটি অনুমোদন করা হবে।’

সম্পূরক প্রশ্নে মো. মোশারফ হোসেন বলেন, গত ১৭ থেকে ২০ বছরে দেশে অনেক শিক্ষিত যুবক বেকার হয়ে পড়েছেন। তাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।

তিনি অভিযোগ করেন, বিগত সরকারের সময়ে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণের সুযোগ পেত না। এ কারণে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এ প্রক্রিয়া থেকে বাইরে ছিল।

মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ইন্টেরিম গভমেন্ট যদি এটাকে একদিন বা সাত দিনে পারে, তাহলে আমাদের বর্তমান সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।’

তিনি বলেন, ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজ করা হলে শিক্ষিত বেকার যুবকসহ দেশের সাধারণ মানুষও টেন্ডারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এমনকি চাকরির বয়স পেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরাও এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজের সুযোগ পেতে পারেন।

এ সময় স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, ছয় মাস চলে গেল, আর কয় মাস লাগবে?’

জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল, বর্তমান সরকার সেভাবে কাজ করার সুযোগ পায়নি। কারণ বর্তমান সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আইন-কানুন ও নির্ধারিত নিয়মের মধ্য দিয়েই কাজ করতে হয়।

আইনমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ছিল একটি সাময়িক ব্যবস্থা। সে সময়ে তাৎক্ষণিকভাবে নেওয়া অনেক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দেশের সাধারণ আইন ও সাংবিধানিক বিধিবিধান অনুসরণের বাধ্যবাধকতা একইভাবে কার্যকর ছিল না। কিন্তু বর্তমান সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও আইনের শাসনকে গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।

তিনি বলেন, ‘ভালো কাজ করতে গেলে অনেক সময় একটু সময় লাগে। আইন অনুসরণ করতে হয়, নিয়ম-কানুনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তাড়াহুড়ো করে আমরা যদি কোনো আইনের ব্যত্যয় করি, তাহলে দেশবাসীর কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।’

তবে মোশারফ হোসেনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি যে কথাগুলো বলেছেন, অত্যন্ত যুক্তিসংগত।’

তিনি বলেন, কর্মসংস্থান শুধু টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমেও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

পরে আইনমন্ত্রী জানান, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০০৮ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে সংশোধন করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষকে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে দূরে রাখতে একটি বিশেষ ধরনের সিন্ডিকেট ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।

তিনি বলেন, বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর সরকার চাইলে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারত। তবে যথাযথ প্রক্রিয়ায় এগোতে মন্ত্রিসভা একটি সাব-কমিটি গঠন করেছে।

আইনমন্ত্রী জানান, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট ও রুলসকে যুগোপযোগী করে সিন্ডিকেট এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা দূর করতে কাজ চলছে। এ বিষয়ে গঠিত সাব-কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন এবং একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, অচিরেই সংশোধিত প্রস্তাব সংসদের সামনে উপস্থাপন করা হবে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে টেন্ডার সিন্ডিকেট ভাঙার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *