কামরুল ইসলাম:
লক্ষ লক্ষ মুসল্লির সম্মিলিত ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনি, দরুদ-সালাম ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতীতে শেষ হয়েছে ১৯ দিনব্যাপী ৫৬তম আন্তর্জাতিক মাহফিলে সীরাতুন্নবী (সা.)। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) চুনতীর শাহ্ মনজিল সীরত ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহাসিক এ মাহফিলের সমাপনী আয়োজন। এতে বক্তারা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে শান্তি, ন্যায়, ঐক্য ও মানবিকতা প্রতিষ্ঠায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণের আহ্বান জানান।
যুগশ্রেষ্ঠ আলেম হযরত মাওলানা হাফেজ আহমদ প্রকাশ শাহ্ সাহেব কেবলা চুনতী (রহ.) প্রবর্তিত এ ঐতিহাসিক মাহফিল দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। ১৯ দিনব্যাপী এবারের আয়োজনেও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি ও ধর্মপ্রাণ মানুষ চুনতীর সীরত ময়দানে সমবেত হন।
সমাপনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাহফিল মোতাওয়াল্লী কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব মাওলানা হাফিজুল ইসলাম আবুল কালাম আজাদ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাহারবিল আনোয়ারুল উলুম কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মাওলানা রুহুল কুদ্দুস আনোয়ারী, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর ড. মাওলানা আবু বকর রফিক আহমদ এবং চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার সাবেক অধ্যক্ষ আলহাজ্ব মাওলানা মাহমুদুল হক।
বিশেষ মেহমান হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব শাহজাহান চৌধুরী ও আলহাজ্ব নাজমুল মোস্তফা আমিন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন চুনতী হাকিমিয়া কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ফারুক হোসাইন।
সমাপনী বক্তব্যে মাহফিল মোতাওয়াল্লী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহজাদা মাওলানা আব্দুল মালেক মুহাম্মদ ইবনে দিনার নাজাত ১৯ দিনব্যাপী আয়োজনের সার্বিক ব্যবস্থাপনা, শৃঙ্খলা ও সফল সমাপ্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এ সময় তিনি মাহফিল আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সীরাতের এ ঐতিহাসিক আয়োজনকে আরও বিস্তৃত, সুন্দর ও সুসংগঠিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সমাপনী দিনে ‘হযরত মু’আয (রা.)-কে প্রদত্ত রাসূল (সা.)-এর ১০টি অসিয়ত’ বিষয়ে দরসে হাদিস পরিচালনা করেন বান্দরবান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের খতিব আলহাজ্ব মাওলানা আলা উদ্দিন ইমামী। ‘বিদায় হজে রাসূল (সা.)-এর প্রদত্ত ভাষণের গুরুত্ব ও তাৎপর্য’ বিষয়ে আলোচনা করেন সাবেক ধর্ম উপদেষ্টা আলহাজ্ব ড. মাওলানা আ.ফ.ম. খালেদ হোসাইন।
‘ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা’ বিষয়ে বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মাওলানা বি.এম. মুফিজুর রহমান আজহারী। ‘শান্তির সমাজ প্রতিষ্ঠায় মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ (সা.)’ বিষয়ে আলোচনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের প্রফেসর ড. মাওলানা আ.ক.ম. আবদুল কাদের। ‘ইসলামের দৃষ্টিতে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা এবং অনৈক্যের কারণ ও পরিণতি’ বিষয়ে বক্তব্য দেন ঢাকার মুফতি মাওলানা আলী হাসান ওসামা।
বক্তারা বলেন, ইসলাম কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও আদর্শ মানবজাতির জন্য শান্তি, ন্যায়, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশেষ করে বিদায় হজের ভাষণে মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সাম্য ও ঐক্যের যে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করা গেলে বিভাজন, অশান্তি, হিংসা ও নৈতিক অবক্ষয় অনেকাংশে দূর করা সম্ভব।
তারা আরও বলেন, বর্তমান সময়ে সমাজে পারস্পরিক বিভেদ, হিংসা, বিদ্বেষ ও নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে রাসূল (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ এবং তাঁর শিক্ষা ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায় পর্যন্ত ন্যায়, সততা, পারস্পরিক সম্মান ও সহমর্মিতার চর্চা বাড়াতে হবে।
১৯ দিনব্যাপী এ আয়োজনে ‘ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের প্রামাণ্য’, ‘কামিল মুরশিদের পরিচয় ও গুণাবলি’, ‘আল-কোরআন ও বিজ্ঞান’, ইবাদত ও নামাজের গুরুত্বসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দেশের বিশিষ্ট আলেম, ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষকরা আলোচনা করেন। মাহফিলজুড়ে কোরআন-হাদিসের শিক্ষা, মহানবী (সা.)-এর জীবনাদর্শ এবং ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন বক্তারা।
সমাপনী মোনাজাতকে কেন্দ্র করে শনিবার চুনতীর শাহ্ মনজিল সীরত ময়দান ও আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা মুসল্লিদের উপস্থিতিতে পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। মোনাজাত শুরু হলে চারদিকে নেমে আসে এক আবেগঘন পরিবেশ। ইমামের সঙ্গে একযোগে লক্ষ লক্ষ মুসল্লির ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো সীরত ময়দান। দরুদ-সালাম ও মোনাজাতের মধ্য দিয়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা দেশ, জাতি, মুসলিম উম্মাহ এবং বিশ্বমানবতার শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন।
দীর্ঘ ১৯ দিনের নানা আয়োজন শেষে দরুদ-সালাম, মোনাজাত ও লাখো মানুষের সম্মিলিত ‘আমিন, আমিন’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে পর্দা নামে চুনতীর ৫৬তম আন্তর্জাতিক মাহফিলে সীরাতুন্নবী (সা.)-এর। ঐতিহাসিক এ আয়োজনের মাধ্যমে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনাদর্শ অনুসরণ করে শান্তি, ঐক্য, ন্যায় ও মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা।